চাঁপাইনবাবগঞ্জ/৩২ মাসে সড়কে ১৪৫ মৃত্যু, ৬৭ জনই মোটরসাইকেল আরোহী

‘সামনে ২২ চাকার বিশাল ট্রাক, আর আমি বাইকসহ ছিটকে গিয়ে সোজা রাস্তার পাশে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছিল আজই জীবনের শেষ দিন। মাথায় হেলমেটটা ছিল বলে সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছে। হাসপাতালে কিছুদিন থাকার পর এখন বুঝতে পারছি, নিরাপদে সুস্থ শরীরে ঘরে ফেরার চেয়ে বড় কোনো অর্জন হতে পারে না।’ বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে এভাবেই সড়কে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সাব্বির আহমেদ।
সাব্বির বেঁচে ফিরলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বহু পরিবার প্রতিদিন হারাচ্ছে তাদের সন্তানদের। তবে কেবল মোটরসাইকেলই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান প্রধান সড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, লাইসেন্সহীন ভটভটি-নসিমন, বেপরোয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং দ্রুতগামীর পণ্যবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিদিন অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা ও এফআইআর (FIR) তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেখা গেছে, গত ৩২ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘটে যাওয়া প্রাণহানির পেছেনে দায়ী এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট ৩২ মাসে জেলায় ছোট-বড় বহু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুঘটনায় মোট ১৪৫ জন মানুষ মারা গেছেন। মোট প্রাণহানির মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাতেই নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭ জনে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৬ দশমিক ২১ শতাংশ। আর বাকি অর্ধেকেরও বেশি প্রাণহানি ঘটেছে দ্রুতগামী ট্রাক, থ্রি-হুইলার ও স্থানীয়ভাবে তৈরি অবৈধ যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং বেপরোয়া চলাচলের কারণে।
২০২৪ সালে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৮৮ জন মানুষ মারা যান, যার মধ্যে ৪১ জন ছিলেন মোটরসাইকেল আরোহী এবং বাকি ৪৭ জন মারা যান ট্রাক, অটোরিকশা ও ভটভটিসহ অন্যান্য যানবাহনের দুর্ঘটনায়। ওই বছর এসব ঘটনায় মোট ৯০টি মামলা রুজু হয়। ২০২৫ সালে এসে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ জনে, যার মধ্যে ১৭ জন বাইক আরোহী এবং ২৩ জন অন্যান্য যানবাহনের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এ বছর মোট ৪০টি জিডি নথিভুক্ত করা হয়। আর চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত মোট ১৭ জন মানুষ সড়কে মারা গেছেন। এর মধ্যে ৯ জন মোটরসাইকেল আরোহী এবং ৮ জন অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান। এই সময়ে মোট ১৫টি মামলা রুজু করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু কারণ সামনে এসেছে। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তরুণ ও কিশোরদের বেপরোয়া গতি, লাইসেন্স না থাকা এবং হেলমেট ব্যবহারে অবহেলাকে প্রধান কারণ মনে করছেন স্থানীয়রা। তেমনি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল বড় ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। ভটভটি বা নসিমনের কোনো যান্ত্রিক ফিটনেস বা কার্যকর ব্রেকিং সিস্টেম না থাকায় দ্রুতগতিতে ব্রেক কষলে এগুলো উল্টে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে, সোনামসজিদ স্থলবন্দর রুটে দ্রুতগামী ট্রাকের বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং চালকদের অসাবধানতার কারণে পথচারী ও ছোট যানবাহনের যাত্রীরা প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন।
শ্রেণিকক্ষ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে উঠতি বয়সের কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এবং বিশৃঙ্খল সড়ক পরিবেশ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের স্কুলের অনেক শিক্ষার্থীকে দেখি নিজেদের বাইকে স্কুলে আসে। তাদের মধ্যে নিয়ম মানার চেয়ে গতি দেখানোর প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে রাস্তাগুলোতে বেপরোয়া অটোরিকশা ও দ্রুতগামী ট্রাকের কারণে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাতায়াত করাও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবার ও চালকদের দায়িত্বশীল না করা গেলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো অসম্ভব।
কিশোরদের হাতে বাইক তুলে দেওয়া এবং ছোট যানবাহনে অনিরাপদ যাতায়াত নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলছেন অভিভাবকরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৫-১৬ বছরের ছেলের আবদার মেটাতে গিয়ে বাবা-মা গাড়ি কিনে দিয়ে সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। সন্তানদের যেমন বাইক দেওয়া বন্ধ করতে হবে, তেমনি সড়ক থেকে অবৈধ ও ফিটনেসহীন যানবাহন চালানোও বন্ধ করতে হবে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর রুট দিয়ে প্রতিদিন শত শত দ্রুতগামী পণ্যবাহী ট্রাক ও ট্রেইলার যাতায়াত করে। আর একই সরু রাস্তায় প্রতিযোগিতা দিয়ে চলে অটোরিকশা, সিএনজি, ভটভটি ও মোটরসাইকেল।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর রুটের নিয়মিত ট্রাকচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভারী মাল বোঝাই একটা ট্রাক ব্রেক কষে তাৎক্ষণিকভাবে থামানো সম্ভব না। কিন্তু সড়কের ওপর ছোট ছোট অটোরিকশা, সিএনজি বা বাইকগুলো হঠাৎ ব্লাইন্ড স্পটে চলে আসে এবং ট্রাফিক নিয়ম না মেনে সামনে ঢুকে পড়ে। এতে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বড় ট্রাকের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট যানবাহনের মহাসড়কে চলাচলে সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা খুব জরুরি।
জেলা পুলিশের উদ্যোগ
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আধুনিক এআই-সক্ষম সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ৩২টি এআই সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ আরও কার্যকর হবে।
পৌরসভা ও পরিবহন মালিকদের সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ইজিবাইক ও সিএনজি মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে কমিউনিটি ট্রাফিক পুলিশ ব্যবস্থাকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে বিশেষ করে কিশোরদের অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টে চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ট্রাফিক আইন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা এসব কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন। জেলা পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাইকিং ও অন্যান্য প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, পুলিশ মামলা দিতে পারে বা জরিমানা করতে পারে, কিন্তু ট্রাকচালক, অটোরিকশাচালক কিংবা বাইকাররা নিজে সচেতন না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সড়ক নিরাপত্তাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে এক হয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে সড়কে আর কোনো প্রাণ অকালে ঝরে না যায়।
তিনি আরও বলেন, সড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর পুলিশকে তার দায়িত্ব অনুযায়ী আইন প্রয়োগ করতে হবে। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করি, তাহলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
