logo

সুনামগঞ্জ/সংঘর্ষে একজন নিহতের পর তিন দিন ধরে ৪০ বাড়িতে লুটপাটের অভিযোগ

সংঘর্ষে একজন নিহতের পর তিন দিন ধরে ৪০ বাড়িতে লুটপাটের অভিযোগ
শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের আসবাবপত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পতিত জমির দখল নিয়ে গ্রামের দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের প্রায় ৪০টি বাড়িঘরে টানা তিন দিন লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের নিজগাঁও গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিপক্ষের পুরুষশূন্য বাড়িঘর থেকে ধান-চাল, স্বর্ণালংকার, আসবাব, জমি চাষের পাওয়ার টিলার, কৃষিকাজের ইঞ্জিন, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও নৌকাসহ অন্তত অর্ধকোটি টাকার সম্পদ লুট করা হয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর গ্রামের পাশের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

রাতের আঁধারে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেছেন, সংঘর্ষের পর পুলিশ পৌঁছানোর আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখনো এমন ঘটনা ঘটে থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রামের পূর্ব পাশে একটি পতিত জমির দখল নিয়ে রুপ মিয়া ও আজব আলীর মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত ৩১ অক্টোবর দুই পক্ষের সংঘর্ষে রুপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হন। এরপর পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে আজব আলীর পক্ষের লোকজন গ্রাম ছেড়ে চলে যান। তাদের বাড়িঘরে তখন লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাজারে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও গ্রামটি কিছুটা দূরে হওয়ায় সেই সুযোগে লুটপাট চালানো হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর রুপ মিয়ার পক্ষের লোকজন তাদের বাড়িঘরে টানা তিন দিন লুটপাট চালিয়েছেন। এই তিন দিনে আজব আলীর পক্ষের এলিম উদ্দিনসহ প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৫টি গরু, পাঁচটি পাওয়ার টিলার, দুটি মোটরসাইকেল, টিউবওয়েলের পানি তোলার পাঁচটি মোটর, ডিজেলচালিত ২০টি ইঞ্জিন, দুটি ধানমাড়াইকল, শতাধিক বস্তা বোরো বীজধান, প্রায় ৪০০ মণ বোরো ধান, দুটি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ পাঁচ লাখ টাকা এবং তিন ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও হাঁড়িপাতিলও নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাড়িছাড়া হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নারীরা।

নিজগাঁও গ্রামের মৃত উমর আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, রাতে এসে ঘরের দরজা খোলার জন্য অনেক লাথি মেরেছে। ঘরের বেড়ায় লাথি মেরেছে, গালাগাল করেছে। কিন্তু ভয়ে আমরা দরজা খুলিনি। ঘরের বাইরে আমার দুই ছেলের দুটি মেশিন, চারটি গরু ও একটি নৌকা ছিল। সেগুলো নিয়ে গেছে।

মাসুম মিয়ার স্ত্রী মোছা. আসমিনা বেগম বলেন, বাড়িঘরের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। তিন দিনের লুটপাটে আমরা এখন পথের ফকিরের মতো হয়ে গেছি। ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি সোনা, ১৭টি গরু, নগদ পাঁচ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানি তোলার মোটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি, ধান ভাঙানোর মেশিনসহ ঘরে যা ছিল, সব নিয়ে গেছে। আমরা এখন চলব কীভাবে?

রেজু মিয়ার স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, আমার ও আমার শাশুড়ির খাট-পালঙ্ক, আলমারি, ঘরের সব জিনিসপত্র, হাঁড়িপাতিল, ধান-চাল, জমিতে পানি দেওয়ার পাম্প লুট করে নিয়ে গেছে। রান্নার সব চুলা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ঘরে রান্না করার মতো কিছুই নেই।

আহাদ নুর মিয়ার স্ত্রী লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কোনো বাড়িতেই পুরুষ মানুষ নেই। ফাঁকা বাড়ি থেকে গরু-বাছুর, ধান-চাল সব নিয়ে গেছে। এখন পানি খাওয়ার একটি গ্লাসও নেই। ৫০ কিয়ার জমির খড় ছিল, গভীর রাতে আগুন দিয়ে সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে।

পুলিশের ভয়ে বাড়িছাড়া গ্রামের এলিম উদ্দিন। লুটপাটের খবর পেয়ে তার ছোট বোন মাহমুদা আক্তার ভাইয়ের বাড়ি দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, এমন ঘটনা জীবনে দেখিনি। ফাঁকা বাড়িতে নারীদের গালিগালাজ ও হুমকি দিয়ে সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর রুপ মিয়ার লোকজন আমাদের পক্ষের প্রায় ৪০টি বাড়ির কোনো কিছুই বাকি রাখেনি।

তবে লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিহত আব্দুল মান্নানের চাচাতো ভাই রুপ মিয়া। তিনি বলেন, জমিটি আমার বাবার নামে। আমি সেখানে মাটি ভরাটও করেছি। এখন আজব আলী এই জায়গা তার বলে দাবি করছেন। আজব আলীর লোকজনের হামলায় আমার ভাই আব্দুল মান্নান মারা গেছেন। এ ঘটনায় ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন। আমার বাঁ পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। আমি বিছানা থেকে উঠতে পারি না।

লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে রুপ মিয়া আরও বলেন, আমাদের কেউ প্রতিপক্ষের বাড়িঘর লুটপাট করেনি। অন্যের জিনিসপত্র আনতে সবাইকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। তারা নিজেরাই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মালামাল সরিয়ে আমাদের অভিযুক্ত করছে। পুলিশকে আমরা জানিয়েছি, যারাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, সংঘর্ষের পর রাতে নিজগাঁও গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, এটি সত্য। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তিনি জানেন না। একটি বাড়ির বিশাল খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। অনেকেই তাকে জানিয়েছেন, ধান-চাল, পাওয়ার টিলার ও ইঞ্জিন লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর নিজগাঁও গ্রামে পুলিশ পৌঁছানোর আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখন গ্রামের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে। গ্রামের সবার বাড়িঘরে পুলিশের পক্ষে যাওয়া কঠিন। তবে পুলিশ এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।