
চাকরি করে জীবিকা নির্বাহের চেয়ে নিজের কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০০৮ সালে চাকরি ছেড়ে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা বাজারের পাশে জমি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন আইসক্রিমের কাঠি তৈরির কারখানা। মাত্র ১৭ জন শ্রমিক নিয়ে শুরু করা সেই কারখানা এখন দুটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। সেখানে সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ৮০ জন নারী-পুরুষ। আর কাঠ ব্যবসায়ী, করাতকলের (স’মিল) শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকসহ পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আশপাশের অন্তত দুই শতাধিক পরিবার।
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। সেখানে বিভিন্ন মাপ ও আকৃতির পাঁচ ধরনের আইসক্রিমের কাঠি তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে অন্তত ৫০ লাখ কাঠি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আইসক্রিম কারখানায় এসব কাঠি সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে নিয়মিত তিনটি আইসক্রিম কারখানায় এখানকার কাঠি ব্যবহার করা হচ্ছে।
কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কাঠের খণ্ড প্রথমে ফিলিং মেশিনে দেওয়া হয়। সেখানে কাঠকে পাতলা পাতে পরিণত করা হয়। পরে সেই পাত কাটিং মেশিনে দিয়ে নির্দিষ্ট মাপের ছোট ছোট কাঠি তৈরি করা হয়। এরপর ড্রামে দিয়ে কাঠিগুলো পালিশ করা হয়। সবশেষে রোদে শুকিয়ে বাছাই, গ্রেডিং, বান্ডিল ও প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হয়।
উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চাকরি করার সময় থেকেই নিজের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইচ্ছা ছিল। সেই চিন্তা থেকেই ২০০৮ সালে চাকরি ছেড়ে আইসক্রিমের কাঠি তৈরির কারখানা শুরু করেন তিনি। শুরুতে শ্রমিক ছিলেন মাত্র ১৭ জন। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বেড়েছে। এখন দুটি কারখানায় প্রায় ৮০ জন সরাসরি কাজ করছেন।

জাহাঙ্গীর আলম জানান, আইসক্রিমের কাঠি তৈরিতে কদম, আমড়া, ছাতিমসহ বিভিন্ন ধরনের নরম কাঠ ব্যবহার করা হয়। তার কারখানায় স্থানীয়ভাবে ‘ভাটাম’ বা ‘ভেটুল’ নামে পরিচিত গাছের কাঠও ব্যবহার করা হয়। কাঠ সংগ্রহের সঙ্গে কাঠ ব্যবসায়ী ও করাতকলের শ্রমিকেরা যেমন যুক্ত, তেমনি পরিবহন শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে এই শিল্পকে ঘিরে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কারখানাটি মেশিননির্ভর হলেও কাঠি বাছাই, গ্রেডিং, বান্ডিল করা ও প্যাকেটজাত করার কাজে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। স্থানীয় বেকার নারী-পুরুষ এখানে কাজ করে আয় করছেন। শ্রমিকদের মাসে ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
কারখানার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ করেন নারীরা। অনেক নারী ঘরে বসেই কাঠি গ্রেডিং, বান্ডিল বাঁধা ও প্যাকেটজাত করার কাজ করছেন। প্রতিটি বান্ডিলে থাকে এক হাজার কাঠি। এসব বান্ডিল ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
কারখানার শ্রমিকেরা জানান, এখানে কাজের পরিবেশ ভালো। নিয়মিত কাজ থাকায় তারা স্বচ্ছন্দে কাজ করছেন। শ্রমিকেরা বলেন, এখানে কাজ করে তারা সংসারের খরচ চালাতে পারছেন। মালিক সময়মতো পারিশ্রমিক দেন। স্থানীয়ভাবে এমন কাজের সুযোগ থাকায় তাদের দূরে গিয়ে চাকরি খুঁজতে হয় না।
কারখানায় উৎপাদিত আইসক্রিমের কাঠি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। গরমের মৌসুমে আইসক্রিমের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠির চাহিদাও বেড়ে যায় বলে জানান উদ্যোক্তা।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই ব্যবসায় বড় ধরনের যন্ত্রপাতি বা বিপুল পুঁজির প্রয়োজন হয় না। মেশিন ও অন্যান্য উপকরণের দামও তুলনামূলক কম। মেধা, পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে অল্প পুঁজি নিয়েও এই শিল্পে ভালো করা সম্ভব। এতে শুধু নিজের কর্মসংস্থান নয়, অন্যদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করা যায়।

