logo

সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালে মেশানো হচ্ছে গন্ধহীন চাল?

সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালে মেশানো হচ্ছে গন্ধহীন চাল?
মোল্লা সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল, প্যাকেটে নেই ধানের জাতের নাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

বাড়তি দামে বাজার থেকে সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল কেনেন ক্রেতারা। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের চালের প্যাকেটে ধানের জাতের নাম লেখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাজারে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ প্যাকেটে নেই জাতের নাম। এমনকি অনেক নামিদামি কোম্পানিও তাদের মোড়কে এটি উল্লেখ করে না। লেখা থাকে শুধু ‘সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল’। এতে বিভ্রান্তিতে পড়ছেন ক্রেতারা।

দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান টি কে এগ্রো ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড। সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালে ক্রেতাদের বিভ্রান্তিতে পড়া নিয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস বর্মনের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বেশির ভাগ কোম্পানি এখন গন্ধহীন ব্রি-ধান ৯০ জাতের চাল সুগন্ধি ব্রি-ধান ৩৪-এর সঙ্গে মিশিয়ে সুগন্ধি চাল বলে বিক্রি করছে।’

বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে নওগাঁর মহাদেবপুর ধানের হাটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। আলাপকালে ব্যবসায়ীরা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে গন্ধহীন ব্রি-ধান ৯০ জাতের ধান সংগ্রহের কথা জানান।

কোম্পানিগুলো তাদের সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের প্যাকেটে ধানের জাত উল্লেখ না করায় এ নিয়ে সংশয়ে থাকেন ক্রেতারা। নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খন্দকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্যাকেটে জাতের নাম না লেখা নীতিমালার লঙ্ঘন।’

দামে বড় ব্যবধান

নওগাঁর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা বাজারে প্রতি কেজি ব্রি-৩৪ জাতের সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায়। ব্রি-৯০ জাতের চাল ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা। অথচ কোম্পানিভেদে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর এক কেজির প্যাকেটজাত চালের মুদ্রিত দাম কমবেশি ২৩০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব প্যাকেট ২০০ থেকে ২০৫ টাকায় কিনে ২১০ থেকে ২১৫ টাকায় বিক্রি করছেন।

খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) বিধিমালা, ২০২৪ অনুযায়ী প্যাকেটজাত খাদ্যদ্রব্যের গায়ে অবশ্যই নির্দিষ্ট জাতের নাম উল্লেখ থাকতে হবে।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খন্দকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্যাকেট বা বস্তার গায়ে চাল কোন ধানের জাত থেকে উৎপাদিত হয়েছে, সেই জাতের নাম লেখা বাধ্যতামূলক। যারা এটা লিখছেন না, তারা নীতিমালার বরখেলাপ করছেন।’

নওগাঁ পৌর বাজারে কথা হয় সুগন্ধি চাল কিনতে আসা ভুট্টোর সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার জানামতে, বাজারে দুই ধরনের সুগন্ধি চাল চলছে। একটি ব্রি-ধান ৩৪ চিনিগুঁড়া, যা অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ও উচ্চমানের। অন্যটি ব্রি-ধান ৯০, যা গন্ধহীন আতপ চাল। ৩৪ চিনিগুঁড়ার চেয়ে ব্রি-৯০ আতপের দাম অনেক কম। কিন্তু প্যাকেটের গায়ে লেখা না থাকায় কোন জাতের চাল তা বোঝার উপায় নেই।’

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘প্যাকেট দেখে চাল চেনার উপায় নেই। রান্নার পরই কেবল বোঝা সম্ভব। ক্রেতাকে যদি রান্নার পর চালের জাত বাছাই করতে হয় এবং তখন সঠিক চাল না পান, তাহলে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

চালের প্যাকেটে ধানের জাতের নাম না থাকার বিষয়ে জানতে নওগাঁয় অবস্থিত দুটি করপোরেট কোম্পানির অফিসে যান এই প্রতিবেদক। তবে দুই জায়গাতেই ভেতরে প্রবেশে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। মহাদেবপুরের সুজইল হাট এলাকায় অবস্থিত মোল্লা সল্ট এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডে গেলে সেখানকার এক কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে এমন ভুল সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেন। জানান, পরবর্তীতে প্যাকেটে ধানের জাতের নাম উল্লেখ করা হবে।

সদর উপজেলার টি কে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে প্রবেশ করতে চাইলে কর্তব্যরত মানবসম্পদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু জাহিদ শিকদার সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে মোবাইলে কথা হয় সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস বর্মনের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, তাদের কোম্পানির প্যাকেট ঢাকার কারখানা থেকে তৈরি হয়। তবে তারা বস্তা ও এক কেজির চিনিগুঁড়া চালের প্যাকেটে ধানের জাতের নাম উল্লেখ করেন। যদিও অনেক কোম্পানি এটি উল্লেখ করে না।

সত্যজিৎ দাস বর্মন জানান, তার কোম্পানি ব্রি-ধান ৩৪-এর পাশাপাশি ব্রি-ধান ৯০ জাতের ধানও কেনে। কারণ, তাদের নবাবী ভোগ আতপ চাল নামে একটি ব্র্যান্ড আছে। এর ২৫ কেজি ও ৫০ কেজির বস্তা তারা বিক্রি করেন। সেই বস্তার গায়ে ধানের জাতের নাম লেখা থাকে। এটিকে সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল বলা হয় না। ব্রি-ধান ৩৪ থেকে পাওয়া সুগন্ধি চালকেই কেবল সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল হিসেবে বিক্রি করা হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রি-ধান ৩৪-কে টেক্কা দিতে ব্রি-ধান ৯০ উদ্ভাবন করেছে। এই ধানের কোনো গন্ধ নেই, শুধু নামে আতপ চাল।

নওগাঁর মহাদেবপুরের ধ্যানা হাটিতে হাটের দিনে ব্রি-ধান ৩৪ (সুগন্ধি চিনিগুঁড়া), ব্রি-ধান ৯০ (গন্ধহীন আতপ) এবং স্থানীয় চিনি আতপ জাতের ধান কেনাবেচা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, নামিদামি কোম্পানিগুলোর এজেন্টরা তাদের কাছ থেকে এই তিন জাতের ধান সংগ্রহ করেন।

ধান ব্যবসায়ী গোলাম রাব্বানী জানান, নামিদামি কোম্পানির প্রতিনিধি ও বড় ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে ব্রি-ধান ৯০ জাতের আতপ ধান কেনেন। ধান কিনে তারা গুদামে নিয়ে যান।

মহাদেবপুর উপজেলার চিনিগুঁড়া চাল উৎপাদনকারী রাজিয়া অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক জাহাঙ্গীর আলম শাহীন। তিনি জানান, উৎপাদনের পর তার মিল থেকে কোম্পানির লোকজন চিনিগুঁড়া চাল নেওয়ার সময় ভালোভাবে দেখে নেন। নিজেদের মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ দিয়ে মান যাচাই করেন। ব্রি-ধান ৩৪ এবং ব্রি-ধান ৯০; দুটোই আলাদা করে বাছাই করেন। কোম্পানিগুলো যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সেই দামের তুলনায় চাল খারাপ হলে তারা আর নেন না।

মহাদেবপুর উপজেলা কৃষি অফিসার হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ জানিয়েছেন, এই মৌসুমে ব্রি-ধান ৯০ আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর, ব্রি-ধান ৩৪ ১ হাজার ৬০০ হেক্টর এবং স্থানীয় চিনি আতপ আবাদ হয়েছে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। ব্রি-ধান ৯০ দেখতে ব্রি-ধান ৩৪ এবং চিনি আতপ ধানের মতোই। পার্থক্য শুধু গন্ধে। ব্রি-ধান ৯০-এর চালে কোনো গন্ধ নেই, যা অন্য দুই জাতের মধ্যে আছে।

মিছবাহ পাটওয়ারী

সম্পাদনা

মিছবাহ পাটওয়ারী

সহকারী বার্তা সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট