logo

অনুমোদন ছাড়াই নদীর মাটি কাটছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা, ভেকু পুলিশ কনস্টেবলের

অনুমোদন ছাড়াই নদীর মাটি কাটছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা, ভেকু পুলিশ কনস্টেবলের
মেহেরপুরের কাজলা নদীর পাড় থেকে পুলিশ কনস্টেবল রবিউলের এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে কাটা মাটি ট্রাক্টরে বোঝাই করা হচ্ছে; ইনসেটে অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ফিরোজুর রহমান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মেহেরপুরের গহরপুরে কাজলা নদীর পাড় থেকে সরকারি মাটি অপসারণ করে বিভিন্ন ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে মেহেরপুরে কর্মরত এক পুলিশ কনস্টেবলের এস্কেভেটর (ভেকু)। মাটি অপসারণের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম ফিরোজুর রহমান ফিরোজ। তবে মাটি অপসারণের জন্য করা নিলামের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) মেহেরপুর সদর উপজেলার গহরপুর এলাকায় কাজলা নদীর পাড়ে সরেজমিনে দেখা যায়, স্তূপ করে রাখা মাটি এস্কেভেটর দিয়ে কেটে ট্রাক্টরে বোঝাই করা হচ্ছে। পরে সেসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এ সময় ঘটনাস্থলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি।

ফিরোজুর রহমান জানিয়েছেন, তার নিজের ভেকু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বলিয়ারপুর পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত কনস্টেবল রবিউলের কাছ থেকে যন্ত্রটি ভাড়া নিয়েছেন।

অন্যদিকে পুলিশ সদস্য রবিউলের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে এস্কেভেটর ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এস্কেভেটরচালকের সঙ্গে কথা বলে যন্ত্রটির মালিক হিসেবে কনস্টেবল রবিউলের নাম জানা যায়। ফিরোজুর রহমানও বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমার ভেকুটি নষ্ট হয়ে যাওয়াতে রবিউল ভাইয়ের কাছ থেকে ভেকুটি ভাড়া করে এনেছি। আগে মুজিবনগর থানায় ছিল, তখন থেকে তার সঙ্গে পরিচয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, রবিউল মুজিবনগর থানায় কর্মরত থাকাকালে বিভিন্ন এলাকায় এস্কেভেটর ভাড়া দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা করছেন।

কনস্টেবল রবিউলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আপনার মনে হয় কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। আপনি একটু ভালো করে খোঁজখবর নেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কাজলা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় নদীর ১৩ দশমিক ৪০০ থেকে ১৩ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার অংশ থেকে উত্তোলিত মাটি বিক্রির জন্য গত ১৫ জুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। ‘লট নং-নিলাম-০৬/২০২৫-২৬’-এর আওতায় ৬ হাজার ৭৮৯ দশমিক ৭৫ ঘনমিটার মাটি অপসারণের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে এস এম ফিরোজুর রহমানকে নির্বাচিত করা হয়। এ জন্য তার দর ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই নিলামের মেয়াদ গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে।

ফিরোজুর রহমানের দাবি, তিনি মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছেন। আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে অনুমোদনের কাগজ হাতে পাবেন বলে আশা করছেন। বৃষ্টি ও নানা জটিলতার কারণে আগে কাজ শুরু করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।

পরে তিনি এক গণমাধ্যমকর্মীকে আগের নিলামসংক্রান্ত কিছু কাগজ হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। পরে আরেক গণমাধ্যমকর্মীকেও একই ধরনের কাগজ পাঠান।

নিলামসংক্রান্ত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রশাসনিক কিছু নথিপত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নিলামসংক্রান্ত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রশাসনিক কিছু নথিপত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিলামের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মাটি অপসারণ করতে উপজেলা ও জেলা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জেলা কমিটি অনুমোদন দিলে তবেই তারা মাটি নিতে পারবে। তবে সেটা তারা পেয়েছে কি না, এখন পর্যন্ত আমি জানি না। আমি যতটুকু জানি, কাজটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

নিলামের শর্ত অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মাটি অপসারণ করতে হবে। পাশাপাশি, সরানো মাটির পরিমাণ পরিমাপ করে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার কথা। তবে সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি দেখা যায়নি। এতে মাটি অপসারণের অনুমোদন এবং নিলামের শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম কামাল, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) শান্ত দত্ত ও উপসহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কেউ ফোন ধরেননি।

এদিকে সরকারি চাকরিতে থেকে ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগের বিষয়ে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলছি। তবে আপনার আনা অভিযোগের বিষয়টি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই চাকরিবিধি অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আসিফ আল আজাদ

সম্পাদনা

আসিফ আল আজাদ

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট