শয্যার সাড়ে পাঁচ গুণ রোগী, ডেঙ্গুর চাপে হিমশিম খুলনার হাসপাতাল

হাসপাতালের প্রবেশমুখে পা রাখলেই রোগীর ভিড়। করিডর পেরিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকলে শয্যার বদলে চোখে পড়ে মেঝের বিছানা। কোথাও বারান্দায় ঠাঁই নেওয়া রোগী, আবার কোথাও স্বজনের কোলে কাতর শিশু। হেঁটে যাওয়ার মতো জায়গাটুকুও যেন নেই। ৫০০ শয্যার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে এখন প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। অনুমোদিত শয্যার চেয়ে সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি রোগীর ওপর যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ। ফলে খুলনার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ (১৭ আগস্ট) হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে ৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তবে এ সময়ে বেসরকারি হাসপাতালে নতুন কেউ ভর্তি হননি। ডেঙ্গুতে নতুন করে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বিভাগে মোট ৩ হাজার ৪০২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৯৪৮ জন এবং মারা গেছেন ১২ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪০৪ জন।
বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গুর চাপ সবচেয়ে বেশি খুলনা জেলায়। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ভর্তি হয়েছেন ৯৫৬ জন, আর বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১৪৫ জন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬২-তে, আর মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। বর্তমানে সেখানে ১৩৪ জন চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালটির মেডিসিন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা মাত্র ৪০টি, অথচ রোগীর সংখ্যা তার কয়েক গুণ। স্থানসংকটে ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দা ও মেঝেও ব্যবহার করতে হচ্ছে। শিশু ওয়ার্ডের চিত্রও একই। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের নিরাপদ পরিবেশ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে তাওহীদ শেখকে নিয়ে সদর থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন রেজওয়ানুল ইসলাম রিজভী। তিনি বলেন, শয্যা তো দূরের কথা, বারান্দায় বসার জায়গাটুকুও পাইনি। মেঝেতেও জায়গা নেই—চারদিকে শুধু রোগী আর রোগী। মশারি নেই, চারপাশের পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, রোগীর চাপ বেশি হলেও চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি হচ্ছে না। ওষুধ ও ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট পর্যাপ্ত রয়েছে। চাপ আরও বাড়লে জরুরি বিভাগের পাশে নিচতলায় পৃথক ইউনিট চালু করার প্রস্তুতি রয়েছে।
তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী নিয়ে চিকিৎসার মান ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় রাখা সম্ভব—মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে থাকা রোগীদের উপস্থিতি সে প্রশ্নই সামনে আনছে।
একই চিত্র খুলনা জেনারেল হাসপাতালেও। মেডিসিন বিভাগের দুটি ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে মাত্র ২৫টি। রোগীর চাপ এতই বেশি যে জায়গার অভাবে অনেককে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, বহির্বিভাগে আসা রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই জ্বর নিয়ে আসছেন।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যাও প্রায় পূর্ণ। ২৫০ শয্যার সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই; সেখানে ভর্তি রয়েছেন ৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী। ২০৪ শয্যার গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও কোনো শয্যা ফাঁকা নেই, সেখানে চিকিৎসাধীন ৩৭ জন। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ৮০টি শয্যাই পূর্ণ, যার মধ্যে ২১ জন ডেঙ্গু রোগী। আদ্-দীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ভর্তি আছেন ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী।
সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, ১৫ শয্যার ডেঙ্গু ওয়ার্ড পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় আরও ১৯টি কেবিনে রোগী ভর্তি নেওয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোকাররম বিল্লাহ আনসারী জানান, শয্যা খালি থাকলে রোগী ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু বর্তমানে তীব্র শয্যাসংকটের কারণে অনেককে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের পাশাপাশি খুলনা শহরেও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট পর্যন্ত নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ৯৭৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু আগস্টের প্রথম ১৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬২৯ জন। অর্থাৎ চলতি মাসের শুরু থেকেই সংক্রমণের গতি দ্রুত বেড়েছে। নগরীতে এ পর্যন্ত ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে (১১১ জন)। এছাড়া ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ এবং ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এই চারটি ওয়ার্ডকে 'রেড জোন' বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে কেসিসি।
ঝুঁকির পরবর্তী ধাপে রয়েছে ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড—যাকে বলা হচ্ছে 'কমলা জোন'। সেখানে আক্রান্ত ২৫৮ জন। অন্যদিকে 'হলুদ জোনে' থাকা ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে আক্রান্ত হয়েছেন ১১৭ জন।
টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা শাকিল আহমেদ জানান, তাঁর পরিবারের চারজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। শুধু তাঁদের বাড়িতেই নয়, আশপাশের বহু ঘরেই এখন জ্বরের রোগী।
কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শামীমউল ইসলাম বলেন, নগরীর বড় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়া রোগীদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই থেকেই খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছিল, যা আগস্টে আরও তীব্র হয়। হাসপাতালগুলো যখন রোগীর চাপে দিশেহারা, তখন প্রশ্ন উঠছে—মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে আরও আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলো না কেন?
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খুলনা জেলা সভাপতি কুদরত-ই-খুদা বলেন, এখন বিশেষ তৎপরতা শুরু হওয়া ইতিবাচক। তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ কেন বাড়ল এবং কার গাফিলতিতে পরিস্থিতি এতটা অবনতি হলো, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নগরজুড়ে বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি শুরু করেছে কেসিসি। গঠন করা হয়েছে তিনটি তদারকি দল। ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলোকে তিনটি জোনে ভাগ করে সকাল-বিকেল ওষুধ ছিটানো ও ফগিং করা হচ্ছে।
প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি করে ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন চালু রয়েছে। বড় নালা ও উন্মুক্ত এলাকায় মশা নিধনে 'হুইল বারো ফগার' ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি এডিসের লার্ভার উৎস খুঁজে বের করতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
অপরিচ্ছন্ন বাড়ি ও স্থাপনার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রথম দিন ২৮ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের চারটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মালিকদের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে আমরা উদ্বিগ্ন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া প্রায় কোথাও শয্যা খালি নেই। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। তবে নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।
কারণ, শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। পরিত্যক্ত টায়ার, কৌটো, ফুলের টব, ডাবের খোসা, ডিমের খোসা, বেসিনের নিচে কিংবা ফ্রিজ, এসি ও সানশেডের পাশে জমে থাকা সামান্য পানিই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় জায়গা না পাওয়া রোগীদের দীর্ঘ সারি যেন সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে—মশা মারার অভিযান যদি রোগী বাড়ার পর শুরু হয়, তবে শয্যা যত বাড়ানোই হোক না কেন, সংকটের সমাধান হবে না।
খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্ষাকালে নিচু এলাকা ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলা, ৫৯টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কিছুটা বেড়েছে। তবে বিভাগীয় কমিশনার, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা জরুরি। তিনি সবাইকে নিজ নিজ ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য পরিচালক আরও জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনুমোদিত শয্যা ৫০০টি হলেও প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ২০ বছর ধরে খুলনা বিভাগে চাহিদানুযায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুলনা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।




