logo

পদ্ম-শাপলার সৌন্দর্যে ভুতিয়ার বিল, জলাবদ্ধতায় ডুবছে জীবিকা

পদ্ম-শাপলার সৌন্দর্যে ভুতিয়ার বিল, জলাবদ্ধতায় ডুবছে জীবিকা
পদ্মপাতায় ভরা জলরাশির বুক চিরে এগিয়ে চলে ডিঙি নৌকা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভোরের আলোয় সবুজ পদ্মপাতার ফাঁকে ফুটে ওঠে লাল-গোলাপি পদ্ম আর লাল-সাদা শাপলা। শিশিরের মতো পানির ফোঁটা, পাখির ওড়াউড়ি আর ফুলে ভরা জলরাশির বুক চিরে এগিয়ে চলে ডিঙি নৌকা। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই বিলে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। কিন্তু চোখজুড়ানো দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, কমছে চাষযোগ্য জমির ব্যবহার। জীবিকার সংকটে পড়ছেন বিলপাড়ের বহু মানুষ।

খুলনার তেরখাদা উপজেলা ও নড়াইল জেলার অংশবিশেষজুড়ে বিস্তৃত ভুতিয়ার বিল বর্ষা ও শরৎকালে পদ্মফুলের জন্য দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর আয়তনের এই বিলের মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হেক্টর জমিতে পদ্মফুল ফোটে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। বিলের বাকি বড় অংশ আগাছা ও শ্যাওলায় ভরা। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত এই জলাভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা ও কৃষিকাজের সংকট রয়ে গেছে।

ভোরেই দর্শনার্থীদের ভিড়

ভুতিয়ার বিলে পদ্মফুল দেখার উপযুক্ত সময় ভোর ৬টা থেকে সাড়ে ৬টা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মের পাপড়ি বুজে আসে। এ কারণে সকালেই দর্শনার্থীদের আনাগোনা বাড়ে। খুলনা শহর থেকে আসা জামশেদ, ফাইয়ায ও রফীকুল আলম বলেন, ভুতিয়ার বিলের সৌন্দর্য অসাধারণ। তবে কিছু দর্শনার্থী বেশি ফুল তুলে নষ্ট করেন, যা তাদের খারাপ লাগে।

পদ্মফুল ঘিরে স্থানীয়দের জন্য মৌসুমি আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে। নৌকার মাঝি সাকিব বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে এলাকার অনেকে নৌকা চালিয়ে দর্শনার্থীদের বিল ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। পদ্মফুলের মৌসুমে পর্যটক বাড়লে নৌকার চাহিদা বাড়ে, এতে তাদের আয় হয়।’

স্থানীয় নৌকার চালকদের ভাষ্য, ছোট নৌকায় এক-দুজন নিয়ে বিল ঘুরতে ভাড়া লাগে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বড় নৌকায় সাত-আটজনের জন্য ভাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। নৌকার আকার, যাত্রীর সংখ্যা ও দূরত্বের ওপর ভাড়া নির্ভর করে। শুক্র ও শনিবার পর্যটকের সংখ্যা বেশি থাকলেও সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে অনেক সময় যাত্রীর অপেক্ষায় থাকতে হয়।

দিঘলিয়া থেকে পরিবার নিয়ে আসা জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি আগেও ভুতিয়ার বিলে এসেছিলেন। এবার বিলের ভেতরে অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে প্রচুর ফুল দেখেছেন। তবে আগের তুলনায় ফুলের সংখ্যা কমেছে বলে তার মনে হয়েছে।

পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভাঙাচোরা পথে পরিবার নিয়ে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ। আশপাশে দোকানপাট ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে শিশুদের নিয়ে ঘুরতে আসা সহজ হবে।

দর্শনার্থী আব্দুল জলিল বলেন, বিলের ভেতরে অনেক ফুল রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ফুল না ছিঁড়তে নৌকার মাঝিরা পর্যটকদের নিষেধ করেন। তবে পদ্মফুল রক্ষায় এ উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

জলাবদ্ধতায় ব্যাহত কৃষিকাজ

ভুতিয়ার বিলের সৌন্দর্য ও পর্যটনের সম্ভাবনার বিপরীতে স্থানীয়দের বড় উদ্বেগ দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০০৩ সাল থেকে বিলের প্রায় ২০ হাজার একর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার। একসময় এসব জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হতো। এখন জলাবদ্ধতার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিলপাড়ের তিনটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের হাজারো পরিবার জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়েছে। অনেকে মাছ ধরা এবং শাপলা-শালুক সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ফলে পদ্মফুল ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ভোরের আলোয় সবুজ পদ্মপাতার ফাঁকে ফুটে ওঠে লাল-গোলাপি পদ্ম। ছবি : এশিয়া পোস্ট
ভোরের আলোয় সবুজ পদ্মপাতার ফাঁকে ফুটে ওঠে লাল-গোলাপি পদ্ম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভুতিয়ার বিল দেশি মাছেরও পরিচিত আবাসস্থল। এখানে কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজার, রয়না ও খলিশাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। শীতকালে পানি কমে এলে জাল ও পোলো নিয়ে মাছ ধরতে নামেন স্থানীয়রা। তবে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, আগাছা ও শ্যাওলার বিস্তার এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে।

তেরখাদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলি মজুমদার বলেন, বিলের আয়তন প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর। এর মধ্যে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হেক্টর জমিতে পদ্মফুল ফোটে। বাকি অংশ আগাছা ও শ্যাওলায় ভরা।

পর্যটনকেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা

ভুতিয়ার বিলের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা সুলতানা নীলা বলেন, পর্যটন একটি সম্ভাবনাময় খাত। এ খাতকে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল বলেন, এলাকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, মৎস্য ও ব্যবসা। ভুতিয়ার বিল নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। পদ্মফুল দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসায় স্থানীয়দের আয় ও এলাকার পরিচিতি বাড়ছে।

যেভাবে যাবেন ভুতিয়ার বিলে

খুলনা শহর থেকে জেলখানা ঘাট পার হয়ে তেরখাদা বাজারে গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় ভুতিয়ার বিলে পৌঁছানো যায়। বিকল্প পথে সেনেরবাজার থেকে তেরখাদাগামী বাসে হাড়িখালী নেমে ইজিবাইকে চরকুশলা গ্রামে যেতে হয়। সেখান থেকে ডিঙি নৌকায় বিলে পৌঁছানো যায়। খুলনা থেকে চরকুশলা যেতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগে। বিলে ঘোরার সময় নৌকার ধারণক্ষমতা মেনে চলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ভুতিয়ার বিলের পদ্ম-শাপলা যেমন দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে, তেমনি দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা স্থানীয় মানুষের কৃষি ও জীবিকার ওপর চাপ তৈরি করছে। পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ নৌচলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পদ্ম-শাপলার পরিবেশ সংরক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা মোকাবিলা ও কৃষি-মৎস্যনির্ভর মানুষের জীবিকা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ কমানোই ভুতিয়ার বিলের টেকসই উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ।