নিষেধাজ্ঞার আগেই ভোলায় শতাধিক ট্রলার সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি

মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আজ ৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এ সময়ে নদী ও সাগরে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তবে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই ভোলার চরফ্যাশন উপকূলে শত শত মাছ ধরার ট্রলার গোপনে নদী ও সাগরে পাঠানোর প্রস্তুতির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দাদনের টাকা আদায়ের চাপকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির আড়তদার ও মহাজন জেলেদের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরতে উৎসাহিত করছেন।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশনে মোট জেলের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। এর মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত ৪৪ হাজার ২৮১ জন এবং অনিবন্ধিত প্রায় ৪৬ হাজার। সমুদ্রগামী নিবন্ধিত ট্রলারের সংখ্যা ১ হাজার ৩৬৫টি।
স্থানীয় জেলে ও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময় সাগরে ট্রলার সচল রাখার জন্য আগে থেকেই নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘাটের পাশাপাশি মাঝনদীতে ট্রলারে করে বরফ ও জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে বলে তারা দাবি করেছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, সামরাজ, নতুন স্লুইস, খেজুরগাছিয়া, ঢালচর, মাইনউদ্দিসহ বিভিন্ন ঘাট থেকে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগমুহূর্তে কিছু ট্রলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার দুর্গম মোহনা এবং সাগরের গভীর এলাকায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব ট্রলার নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় সেখানে অবস্থান করে মাছ শিকার করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সময় ঘাট থেকে সরাসরি বরফ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় একটি চক্র ভাসমান উপায়ে বরফ সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ট্রলারে করে বরফ মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে মাছ ধরার ট্রলারগুলোর কাছে সরবরাহ করার পাশাপাশি জ্বালানি তেল পৌঁছে দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উপকূলের জেলেদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে মাছ কম পাওয়ায় অনেকেই চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের চাপ। নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা ও বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এই চাপ অনেক জেলেকে ঝুঁকি নিতে বাধ্য করতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
সামরাজ মৎস্যঘাটের আড়তদার হেলাল উদ্দিন টিপু অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সামরাজ ঘাটের ৯৮ জন আড়তদার প্রায় দেড় শত কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। নদীতে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় তেলের খরচও উঠছে না, আড়তদারেরা লোকসানে আছেন। তবে আমরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক জেলে বলেন, আড়তদারের কাছ থেকে দাদন নেওয়া জেলেরা অনেক সময় ঋণের চাপে পড়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নদীতে যেতে বাধ্য হন। এই সুযোগে কিছু আড়তদার নিজেদের দায় এড়িয়ে জেলেদের সামনে ঠেলে দিতে পারেন।
কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ যেন নদী বা সাগরে মাছ ধরতে নামতে না পারে, সে জন্য কোস্ট গার্ডের সদস্যরা সার্বক্ষণিকভাবে তৎপর রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এরই মধ্যে সাগর ও নদীপথে টহল জোরদার করা হয়েছে। আইন অমান্য করে কেউ মাছ ধরতে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। কোনো অবস্থাতেই কাউকে আইন অমান্য করতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে স্থানীয় বরফকলগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হবে, যাতে নদী বা সাগরে বরফ সরবরাহের কোনো সুযোগ না থাকে। পাশাপাশি মাঝনদীতে বরফ বিক্রি বা গোপনে ট্রলারে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে যৌথ টহল জোরদার থাকবে। কেউ গোপনে মাছ শিকারের চেষ্টা করলে বা জেলেদের বাধ্য করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
