logo
Advertisement

বাবা আসবে ভেবেছিল তিন মেয়ে, ফিরলেন কফিনে

এশিয়া পোস্ট নিউজ,রাজশাহী
বাবা আসবে ভেবেছিল তিন মেয়ে, ফিরলেন কফিনে
সৌদি আরবে আগুনে নিহত শ্যামল উদ্দিন মাঝির স্বজনদের আহাজারি। শুক্রবার সকালে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঘরের দরজায় কফিন। চারপাশে স্বজনদের ভিড়। কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছেন স্ত্রী। বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে কফিনের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছে তিন কন্যা। কারও মুখে কোনো কথা নেই। শুধু কান্না ও আহাজারি।

Advertisement

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে এই দৃশ্য দেখা যায় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে শ্যামল উদ্দিন মাঝির বাড়িতে।

এই বাড়িতেই ফেরার কথা ছিল শ্যামল উদ্দিন মাঝির। প্রায় আট বছর আগে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।

স্ত্রী-সন্তানদের ভালো রাখার আশায় প্রবাসের মাটিতে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর এবার দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন ৪৬ বছর বয়সি শ্যামল। কিন্তু দেশে ফিরলেন ঠিকই—তবে জীবিত মানুষ হিসেবে নয়, কফিনবন্দি হয়ে।

বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে শ্যামল উদ্দিন মাঝির মরদেহবাহী কফিন তার বাড়িতে পৌঁছায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তখন কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো বাড়ি। দীর্ঘদিন পর প্রিয় মানুষটি ফিরেছেন—কিন্তু তাকে ছুঁয়ে দেখার, কথা বলার কিংবা জড়িয়ে ধরার সুযোগ নেই।

কফিন খুলে স্বামীর নিথর মুখ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্যামলের স্ত্রী। তিন কন্যাসন্তানও বাবার মরদেহ দেখে নিজেদের সামলাতে পারেনি। তাদের কান্নায় উপস্থিত স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষের চোখেও পানি চলে আসে। অনেকে বিলাপ করছিলেন, পূর্বের স্মৃতিচারণ করছিলেন নিহত শ্যামলের।

শুক্রবার বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় শ্যামলের জানাজা। জানাজায় অংশ নেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ এলাকার বিপুল মানুষ। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।

নিহত শ্যামলের স্বপ্ন ছিল পরিবারকে ভালো রাখার প্রায় আট বছর আগে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে যান শ্যামল উদ্দিন মাঝি।

রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন তিনি। প্রবাসজীবন সহজ ছিল না। পরিবার থেকে দূরে থেকে পরিশ্রম করে উপার্জন করতেন। সেই উপার্জনের ওপরই নির্ভর করত স্ত্রী ও তিন কন্যার সংসার।

স্বজনরা জানান, শ্যামলের একটাই চিন্তা ছিল কীভাবে পরিবারকে একটু ভালো রাখা যায়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। এ কারণেই দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকেও দেশে ফেরেননি তিনি। শেষ কথাতেও ছিল দেশে ফেরার কথা।

শ্যামলের পরিবারের কাছে সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি হয়ে আছে তার সঙ্গে শেষ কথোপকথন। পরিবারের সদস্যদের তিনি জানিয়েছিলেন, শিগগিরই দেশে ফিরবেন। প্রিয় মানুষটির ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী ও তিন সন্তান। হয়তো তারা ভেবেছিলেন, এবার বাড়ির উঠানে বাবাকে জীবিত অবস্থায় দেখা যাবে। বাবার সঙ্গে গল্প হবে, একসঙ্গে খাবার খাওয়া হবে, দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘুচবে।কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হলো ভয়াবহ এক দুঃসংবাদে।

গত ৯ আগস্ট রাতে রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় শ্যামলের কর্মস্থল সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন শ্যামল উদ্দিন মাঝি।