logo
Advertisement

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, বন্ধ ৪ সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, বন্ধ ৪ সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
হাসপাতালে আগুন ও মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর নতুন ভবনের বন্ধ থাকা চারটি সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি থাকলেও এত দিন রোগী ও স্বজনদের জন্য মূলত একটি সিঁড়িই ব্যবহৃত হতো। অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবন থেকে বের হতে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হতাহতের তথ্য নিয়েও দেখা দিয়েছে মতবিরোধ।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান চারটি সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালের নতুন ভবনে মোট পাঁচটি সিঁড়ি রয়েছে। ভবনের চার কোনায় চারটি এবং মাঝখানে একটি সিঁড়ি রয়েছে। রোগী ও তাদের স্বজনেরা মূলত মাঝের সিঁড়িটি ব্যবহার করেন। অন্য চারটি সিঁড়ি খুব কম ব্যবহার হওয়ায় এবং অতীতে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠায় নিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল।

ডা. মাইন উদ্দিন খান বলেন, মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম তার টিম নিয়ে সিঁড়িগুলো পরিদর্শন করেন। এরপর বন্ধ থাকা চারটি সিঁড়ি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিঁড়িগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, লিফটে আগুন লাগার ঘটনায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে। কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়া হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

এর আগে, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় লিফটের কন্ট্রোল রুম অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে ধারণা করে ফায়ার সার্ভিস। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ভবনজুড়ে প্রচণ্ড ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল চত্বরে শত শত রোগী ও তাদের স্বজনকে অবস্থান করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ রোগীও ছিলেন। আতঙ্কে অনেককে কান্নাকাটি করতেও দেখা যায়।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী এবং হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে সোমবার রাতে এশিয়া পোস্টকে ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আগুনের সময় আতঙ্কে একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত বের হতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ৬ জন মারা গেছেন। এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলেও তিনি জানান।

পরে মধ্যরাতে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ তিনি তখনও পাননি। এ ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে দেখা হবে।

বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, ছয়জনের মৃত্যুর যে তালিকা পাওয়া গেছে, সেখানে থাকা পাঁচজনের একজন জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

তিনি জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গের তথ্যের পাশাপাশি তার কাছে আরও একটি তালিকা রয়েছে। সব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত পরিস্থিতি জানা যাবে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসানও সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন তালিকা যাচাই করা হচ্ছে এবং যাদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য কীভাবে এসেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, তারা অন্যদের কাছ থেকে যেভাবে তথ্য পেয়েছেন, সেভাবেই শুনেছেন। এখন সেই তথ্য যাচাই করতে সরেজমিনে তদন্ত চলছে। তথ্য নিশ্চিত হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

সিঁড়িতে পড়ে আহত হয়ে কুলসুমার মৃত্যু

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা যাওয়া কুলসুমা (৩৫) নামের এক নারীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। কুলসুমা ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহীদুল ইসলামের স্ত্রী। কুলসুমার ননদ নাজমা আক্তার বলেন, তার ভাই শহীদুল রিকশা চালিয়ে ও অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের ১২ বছরের ছেলে মো. স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে ১১ দিন ধরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। ছেলেকে সুস্থ করতে কুলসুমা দিনরাত হাসপাতালে ছিলেন।

নাজমা আক্তারের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায় ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। আতঙ্কে রোগী ও স্বজনেরা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। কুলসুমাও ছেলে স্বাধীন ও মেয়ে মীমকে নিয়ে নামার সময় ষষ্ঠ তলা থেকে চতুর্থ তলায় আসার পর পড়ে যান। তখন মানুষের ভিড়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় কুলসুমাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি মারা যান বলে জানান নাজমা আক্তার।

তিনি আরও বলেন, হুড়োহুড়ি করে নামার সময় স্বাধীন মাথায় এবং মীম পায়ে আঘাত পেয়েছে। কুলসুমার মাথা বা শরীরে রক্তাক্ত জখম না থাকলেও তার পেট ফুলে গিয়েছিল বলে জানান তিনি।

ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে বাবার মৃত্যু

ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের নাজিমউল্লাহর ছেলে শাহাজাহান মনির (৪০) প্রায় ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

শাহাজাহানের ছেলে পলাশ মোল্লা বলেন, আগুন লাগার সময় তার বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তারা পড়ে যান। পরে তার মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তারা বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তার বাবা মারা গেছেন এবং স্বজনেরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলে জানান তিনি।

তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমানকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং গণপূর্ত বিভাগের বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী। তদন্ত কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।