logo

বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬ বছর ধরে নেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ

শেখ সোহেল
বাগেরহাট
বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬ বছর ধরে নেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ছয় বছর ধরে নেই কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। হাসপাতালটিতে চক্ষু বিশেষজ্ঞের অনুমোদিত দুটি পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে দুটিই শূন্য। ফলে চোখের নানা সমস্যা নিয়ে সরকারি এই হাসপাতালে আসা রোগীদের অনেককেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা জেলার বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে রোগীদের যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাড়তি এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাগেরহাটের নয়টি উপজেলা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে। বিশেষ করে কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, রামপালসহ দূর-দূরান্তের রোগীরা সরকারি এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগীকে বহির্বিভাগ ও অন্যান্য সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে চোখের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাও কম নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় এসব রোগীর একটি অংশকে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য দুটি অনুমোদিত পদ রয়েছে। বর্তমানে দুটি পদই শূন্য। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে পদ দুটি পূরণ না হওয়ায় সরকারি ব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

চোখের সমস্যা নিয়ে জেলা হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন হলে তাদের বাগেরহাট শহরের বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। আবার উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার কিংবা জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেক রোগীকে খুলনা বা গোপালগঞ্জে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

কচুয়া থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী পারমিতা মিত্র বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে চোখের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকলে এখানেই চিকিৎসা নিতে পারতাম। ডাক্তার না থাকায় বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে খরচও বেশি হচ্ছে।’

রোগীর স্বজন সূর্য বলেন, ‘জেলা হাসপাতালেই যদি চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকতেন, তাহলে চোখের সমস্যা নিয়ে বাইরে যেতে হতো না। সরকারি হাসপাতালে এই সেবাটা থাকা দরকার।’

রামপাল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী বলেন, ‘চোখের সমস্যা নিয়ে অনেক দূর থেকে জেলা হাসপাতালে এসেছি। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে খরচ কম হবে—এই আশায় এসেছিলাম। কিন্তু এখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।’

শুধু চক্ষু বিভাগ নয়, বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল সামগ্রিকভাবেই জনবল সংকটে রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৮৬টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩২ জন। অর্থাৎ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য রয়েছে।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য স্টাফের ঘাটতিও রয়েছে। নির্ধারিত ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে অতিরিক্ত রোগী রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে সরকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিভিন্ন আউটসোর্সিং পদে জনবল নিয়োগ দিচ্ছে। এর আওতায় গ্যালন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে বর্তমানে ৬৬ জন আউটসোর্সিং কর্মী কর্মরত আছেন।

তবে হাসপাতালের প্রয়োজনের তুলনায় আরও ২৮ জন আউটসোর্সিং কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় এসব জনবল নিয়োগ দেওয়া গেলে রোগীদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে চাপ কিছুটা কমবে এবং হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম আরও সহজভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগীর চাপ এবং প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি—সব মিলিয়ে বর্তমানে চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের সংকটের কারণে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বাইরের হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের নতুন ভবনের কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে পুরোনো ভবনেই চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। নতুন ভবন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে।

তবে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে না থাকায় চিকিৎসাসেবায় চাপ রয়ে গেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, ‘হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞের দুটি অনুমোদিত পদ রয়েছে। বর্তমানে দুটি পদই শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জনবল সংকটের মধ্যেও হাসপাতালের পক্ষ থেকে রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। ডেঙ্গু, হামসহ বিভিন্ন রোগীর চাপ রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে সবকিছু সামাল দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও অনেক সময় ৫০০ থেকে ৫৫০ রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি রয়েছে। অনুমোদিত ৮৬টি পদের বিপরীতে ৩২ জন কর্মরত রয়েছেন। চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন হলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।’