বগুড়ায় বেপরোয়া ১৫ কিশোর গ্যাং, ৫ মাসে ৩৯ খুন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বগুড়া
বগুড়ায় বেপরোয়া ১৫ কিশোর গ্যাং, ৫ মাসে ৩৯ খুন
প্রতীকী ছবি

বগুড়ায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত রেষারেষি কেন্দ্র করে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শহরজুড়ে সক্রিয় ১৫টি কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে আতঙ্কে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। একের পর এক ছুরিকাঘাত ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও।

Advertisement

গত ৩১ মে রাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন তরুণ ফটোগ্রাফার ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ। অভিযোগ, মদ্যপ অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছুরিকাঘাত করেন। নিজ বাড়ির সামনেই ঘটে এই ঘটনা। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও এখনও শরীরে বহন করছেন সেই হামলার ক্ষত।

ভুক্তভোগী ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ বলেন, আমি এখনও জানি না আমার অপরাধ কী ছিল। কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে কষ্ট হয়।’

ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও হামলার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্নিগ্ধের মতো ভাগ্যবান ছিল না স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম। গত ১৭ এপ্রিল শহরের শাকপালা এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় সে। একমাত্র সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার দিনমজুর মা। এখনও সন্তানের বই-খাতা, স্কুল ড্রেস আর ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাঝেই খুঁজে ফেরেন তাকে।

সিয়ামের মা বলেন, আমার ছেলেটাকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু বিচার চাই; যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, শুধু বগুড়া শহরেই অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

গত বছরের ২৬ জুলাই শহরের বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ৮১০টি বার্মিজ ও চায়নিজ চাকু উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন অভিযানের পরও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি কমেনি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে বগুড়ার তরুণ সমাজকে সহিংসতার এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বগুড়ায় ৪৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৯টি। একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১০০ জন।

সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা কামাল সরকার বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল বাছেদ বলেন, অপরাধ দমনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পেলে কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতাও কমবে।

বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইনচার্জ ইকবাল বাহার বলেন, বগুড়া শহরের একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এদের কিছু সুশৃঙ্খল এবং কিছু বিশৃঙ্খল। এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া মুখপাত্র) আতোয়ার রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিষয় :বগুড়া