logo

ঠাকুরগাঁও/কমেছে ঐতিহ্যবাহী ধামের গানের আসর, সংকটে শিল্পীরা

কমেছে ঐতিহ্যবাহী ধামের গানের আসর, সংকটে শিল্পীরা
ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী ধামের গান পরিবেশন করছেন শিল্পীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ছেলেরা সেজেছেন মেয়ে। কারও মাথায় খোঁপা, কারও কানে দুল, নাকে নাকফুল। নারীর পোশাকে মঞ্চে অভিনয় করছেন তারা। মঞ্চের চারপাশে বসে আছেন হাজারো দর্শক। এক পাশে নারী, অন্য পাশে পুরুষ। হাসি-আনন্দে মেতে উঠে উপভোগ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী ধামের গান। লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে আয়োজিত এ গানের আসর চলে তিন দিন ধরে।

প্রতি বছর কার্তিক মাসে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধামের গানের আসর বসে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এ লোকজ আয়োজন উপভোগ করতে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সমবেত হন। প্রতিবছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে ধামের গানের আসর। তবে আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে কমছে এ আয়োজনের পরিধি। একসময় জেলাজুড়ে প্রায় ২০০টি আসরে ধামের গান অনুষ্ঠিত হলেও এবার হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি আসরে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) রাত থেকে জেলার বিভিন্ন পাড়ায় শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ গানের আসর। যা চলবে ৩ দিন।

ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধামের গান। একসময় প্রায় প্রতিটি পাড়ায় বসত এ গানের আসর। গ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত তরুণেরা এতে অভিনয় করতেন। পরিবারের সব বয়সি নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ রাতভর একসঙ্গে বসে গান উপভোগ করতেন। তবে দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকটের কারণে জনপ্রিয় এ লোকজ সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

সরকারি সহায়তা ছাড়াই স্থানীয় তরুণেরা গ্রামে গ্রামে চাঁদা তুলে ধামের গানের আয়োজন করেন। সংগৃহীত অর্থ থেকে পালাকারদের সম্মানী দেওয়া হয়। পালার মান বিবেচনায় প্রতিটি পালার জন্য ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী দেওয়া হয়।

ধামের গানের অন্যতম আকর্ষণ নারী চরিত্রে পুরুষদের অভিনয়। নাটকের বিভিন্ন নারী চরিত্রে অভিনয়ের সময় পুরুষ শিল্পীরা নারীদের পোশাক পরেন। মাথায় লম্বা চুলের ঝুঁটি ও খোঁপা, নাকে নাকফুল এবং কানে দুল পরে মঞ্চে হাজির হন তারা। সাজসজ্জা ও অভিনয়ের কারণে অনেক সময় তাদের চেনাও কঠিন হয়ে পড়ে। দর্শকদের আনন্দ দিতেই এভাবে নারী চরিত্রে অভিনয় করেন পুরুষ শিল্পীরা।

ধামের গানে নারী চরিত্রে অভিনয় করা খকেন পাল বলেন, ধামের গানে আগের মতো আর মজা নেই। এখন মানুষ কম দেখতে আসে। গত বছর যেসব জায়গায় ধামের গানের আসর বসেছিল, সেগুলোর অনেক জায়গায় এবার বসেনি। আগের মতো জনপ্রিয়তাও নেই। আগে আসরগুলোতে দিন-রাত তিন দিন ধরে গান চলত। এখন তিন দিনের মধ্যে এক-দুই দিন চলে। সম্মানী কম হওয়ায় অনেকেই আর এ গানে অভিনয় করতে চান না।

আরেক শিল্পী সুদেব পাল বলেন, ছেলে থেকে মেয়ে সাজতে আমাদের অনেক কিছু করতে হয়। এবার মাত্র দুটি মঞ্চে গান করার আমন্ত্রণ পেয়েছি। পুরো জেলায় আগে প্রায় ২০০টি আসর বসত, এবার ২০ থেকে ২৫টি আসরে গান হচ্ছে। তাও শুধু রাতে। একটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন থাকেন। যে টাকা দেওয়া হয়, তাতে খরচ পোষায় না। তবু বাপ-দাদারা এ গান করে এসেছেন বলে আমরাও করে যাচ্ছি।

সালন্দর ইউনিয়নের সিংপাড়ায় গান পরিবেশন করতে এসেছে নেকমরদ হাটের ১৬ দলের ‘সরদারনি’ নামের একটি যাত্রাপালা দল। দলটির পরিচালক জিতেন পাল বলেন, আমাদের গ্রামে যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো নিয়েই আমরা গান তৈরি করি। অনেক সময় বই থেকেও গান তৈরি করি। ছেলেরা মেয়ে সেজে অভিনয় করে। আর মানুষ এসব দেখে আনন্দ পায়।

ধামের গান দেখতে আসা দর্শনার্থী সোহরাব হোসেন বলেন, ধামের গান আমাদের ঐতিহ্য। এখানে হিন্দু-মুসলমান সবাই এক কাতারে বসে গান শোনেন, আনন্দ করেন। তবে প্রতিবছর জেলায় প্রায় ২০০টি আসরে গান হতো। এবার ২০ থেকে ২৫টি আসরে গান হচ্ছে, তাও শুধু রাতে। আমরা চাই, এ ঐতিহ্য টিকে থাকুক। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

আকচা পালপাড়া গ্রামের ধামের গান কমিটির সভাপতি মহেন্দ্র পাল বলেন, আগে আমাদের আসরে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ধামের গান হতো। এখন আর তা হয় না, শুধু রাতে হয়। গানের দলও আগের মতো আসে না। তবে আমরা প্রতিবছর গানের দলগুলোকে নিয়ে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। এবার প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি টেলিভিশন, দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি বাইসাইকেল এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি হারমোনিয়াম দেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৩ নম্বর আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের ধামের গানের সভাপতি নিরব চন্দ্র পাল বলেন, ঠাকুরগাঁও জেলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে ধামের গানের আসর বসে। এটি এ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে এ সংস্কৃতি বিলুপ্তির মুখে। ঐতিহ্যটি রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক রফিকুল হক বলেন, ধামের গান এ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির একটি অংশ। আর্থিক সংকটের কারণে এ সংস্কৃতি বিলুপ্তির মুখে। এটি রক্ষায় আমরা সরকারি উদ্যোগে সাহায্য-সহযোগিতা করব।