
বিষখালী নদীর তীব্র ভাঙনে বিলীনের ঝুঁকিতে পড়েছে ৮৮ বছর পুরোনো বরগুনার বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীভাঙনে এর আগে বিদ্যালয়টির একটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘর বিলীন হয়েছে। পরে নতুন করে নির্মিত ভবন ও সাইক্লোন শেল্টারটিও এখন ভাঙনের মুখে। বিদ্যালয়সংলগ্ন বেড়িবাঁধের বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় নদী এসে ঠেকেছে বিদ্যালয়ের দোরগোড়ায়। এতে আতঙ্কে রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি গত ২৫ বছরে নদীভাঙনের কারণে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করেছে। এলাকাবাসীর দান করা জমিতে ২০০৯ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে নির্মাণের দেড় দশক না পেরোতেই অব্যাহত নদীভাঙনে নতুন ভবনটিও হুমকির মুখে পড়েছে। জোয়ারের সময় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পানি উঠে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলে, ‘বিদ্যালয় রক্ষায় আমরা ব্লক চাই। আমরা আমাদের বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা চাই।’ চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী ও নাজিফা বলে, ‘জোয়ার হলেই বিদ্যালয়ে পানি উঠে যায়। এতে আমাদের ভিজে যেতে হয়। ভেজা জামাকাপড় নিয়েই ক্লাস করতে হয়।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মামতাজ বেগম বলেন, ‘একসময় এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল তিন শতাধিক। বর্তমানে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র ৫০ জনের মতো। নদীভাঙনের আতঙ্কে প্রতিদিন উপস্থিতিও থাকে হাতেগোনা কয়েকজন।’
বিদ্যালয়ের আশপাশের বাসিন্দারা জানান, নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক পরিবারও বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়েছে। দ্রুত বিদ্যালয় রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালিকাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা জব্বার মিয়া বলেন, ‘শুধু বিদ্যালয় নয়, নদীভাঙনে গ্রামের অনেক মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছেন। দফায় দফায় সরকার পরিবর্তন হলেও ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হয়নি।’
কালিকাবাড়ি বালুরঘাট এলাকার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুর রব বলেন, ‘দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণে স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
কালিকাবাড়ি গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক খবির হাওলাদার বলেন, ‘খরস্রোতা বিষখালী নদীর ভাঙনে বেতাগীর কালিকাবাড়িসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার গ্রাম, ফসলি জমি, বসতভিটা ও সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।’
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হান্নান বলেন, বরাদ্দের অভাবে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হয়নি। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় কালিকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রক্ষায় দুই কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বরগুনা সদর, তালতলী, আমতলী, পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা জেলায় ২২টি পোল্ডারের আওতায় ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
