logo

স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরা হলো না আনোয়ারের, বাড়িতে খোঁড়া হচ্ছে কবর

স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরা হলো না আনোয়ারের, বাড়িতে খোঁড়া হচ্ছে কবর
নিহত আনোয়ার হোসেন। ছবি: পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া

বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, এবার স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফিরবেন হয়তো এমনই স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঢাকার কর্মস্থল থেকে রওনা হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন (৩০)।

কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না, পথেই থেমে গেল তার জীবনের সব স্বপ্ন। নাটোরের বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। এদিকে রাজশাহীর বাগমারায় বাড়ির পাশে তার জন্য খোঁড়া হচ্ছে কবর। যে মানুষটির অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনেরা, সেই মানুষটিই ফিরছেন নিথর দেহে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকাল অন্য আট-দশটা দিনের মতোই হয়তো ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজে ব্যস্ত হওয়ার কথা ছিল ফাতেমা বিবির। সন্তানদের নিয়ে কাটত স্বাভাবিক একটি সকাল। কিন্তু তার জীবনে নেমে এলো এমন এক দুঃসংবাদ, যা মুহূর্তেই সবকিছু ওলটপালট করে দিল স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর।

খবরটি শোনার পর থেকেই ভেঙে পড়েন ফাতেমা। স্বামীকে হারানোর শোক কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি; বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ায় ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। পাশে তার দুই সন্তান। তারা হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না যে তাদের জীবনে কী হারিয়ে গেছে। যে বাবা বাড়ি ফিরে তাদের কাছে আসবেন, তাকে আর কখনও দেখতে পাবে না তারা।

জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের চাইপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে। ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন তিনি। সম্প্রতি একটি প্রকল্পে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। নতুন কর্মস্থলে যোগদান শেষে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

জীবনের এই পর্যায়ে নতুন চাকরি হয়তো তার কাছে ছিল এক নতুন সম্ভাবনার সুযোগ। পরিবারকে নিয়ে ভালো থাকার স্বপ্ন আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা—এসবই হয়তো তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ভোরের এক সড়ক দুর্ঘটনা নিমেষেই থামিয়ে দিল তার সব পথচলা।

মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বরিশাল থেকে আসা আরপি পরিবহন-এর একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১৪ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হন। নিহত ব্যক্তিদেরই একজন আনোয়ার হোসেন।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, বাগমারার চাইপাড়া গ্রামে শুরু হয় পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা প্রিয় মানুষটির মরদেহ কখন পৌঁছাবে বাড়িতে।

সকালে আনোয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা ভিড় করছেন। কেউ স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউবা নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে চলছে কবর খননের কাজ। তবে তখনো বাড়িতে পৌঁছায়নি আনোয়ারের মরদেহ। পরিবারের সদস্যদের চোখে-মুখে শোকের পাশাপাশি ছিল প্রিয়জনকে শেষবারের মতো একনজর দেখার আকুল অপেক্ষা।

সকালে মরদেহ আনতে নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন তার চাচা আকতার হোসেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, লাশ লিবার আলছি, এখনো পাইনি। কথাগুলো ছোট হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে স্বজন হারানোর গভীর বেদনা। একদিকে প্রিয়জনের মরদেহ দ্রুত নিয়ে আসার তাগিদ, অন্যদিকে বাড়িতে অপেক্ষমাণ শোকাহত স্বজনেরা।

সকাল ১০টার দিকে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন ফাতেমা বিবি। যে বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে সংসারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাড়িতেই তাকে ফিরতে হলো স্বামীহারা হয়ে।

তার সামনে এখন এক কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা। সংসারের সঙ্গী নেই, সন্তানদের মাথার ওপর থেকে সরে গেছে বাবার ছায়া। সামনে কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে বড় হবে সন্তান দুটি এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। স্বামীর মৃত্যুর শোক সামলে ওঠার আগেই তাকে ভাবতে হচ্ছে সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। যে মানুষটির সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল, তিনি আর কোনোদিন ফিরবেন না এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নেওয়াই এখন তার জন্য সবচেয়ে কঠিন।

আনোয়ারের ভাতিজা মিজানুর রহমান জানান, তার চাচা ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কিছুদিন আগে একটি নতুন প্রকল্পে চাকরি পান। সেখানে যোগদান শেষে বাড়ি ফেরার পথেই দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, বেতার বার্তায় দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। মরদেহের বিষয়ে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগমারা থানা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।