টাকার জন্য ৯ ঘণ্টা হাসপাতালে আটকে রইল রিকশাচালকের মরদেহ

রিকশাচালক জহিরুল ইসলাম (৬০) তিন দিন আগে তীব্র উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকজনিত সমস্যা নিয়ে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তবে হাসপাতালের বিল পরিশোধ নিয়ে জটিলতায় মৃত্যুর পরও প্রায় নয় ঘণ্টা তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, জহিরুলের চিকিৎসার মোট বিল হয় ৭৪ হাজার ৫০২ টাকা। স্বজনদের জমানো টাকা, হাসপাতালের ছাড় এবং গ্রামের প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে ধার করে তারা ৫১ হাজার ৬৭০ টাকা পরিশোধ করেন। এরপরও বকেয়া বিলের জন্য মরদেহ আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।
স্বজনদের অভিযোগ, বকেয়া বিলের বিষয়ে কথা বলতে তারা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালের এক কর্মকর্তা থেকে আরেক কর্মকর্তার কাছে ঘুরেছেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে সাভার থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান রনি ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আলী রেজা রাজু হাসপাতালে যান। তাদের সহযোগিতায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড় নেওয়া এবং গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা সংগ্রহের পর দুপুর একটার দিকে জহিরুলের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
জহিরুল ইসলাম ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে পরিবার নিয়ে সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের সাদাপুর এলাকায় থাকতেন। তার দুই ছেলে ফরিদ ও শহীদ। ফরিদ বাবার মতোই রিকশা চালান। আর শহীদ রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন।
পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা ১৬ মিনিটে তীব্র উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকজনিত সমস্যা নিয়ে জহিরুলকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের তৃতীয়তলায় নিউরোলজি বিভাগের অধীনে স্ট্রোক সেন্টারের ৯ নম্বর শয্যায় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আফতাব হালিমের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে তিনটার দিকে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়।
জহিরুলের ছেলে ফরিদ বলেন, আমার বাবাও রিকশা চালাইতেন। আমিও রিকশা চালাই। প্রেসার বেশি হওয়ায় তিন দিন আগে এনাম মেডিকেলে ভর্তি করাইছিলাম। আমগো কাছে টাকা আছিল না। গ্রামবাসী আর প্রতিবেশীদের কাছ থেইকা টাকা এনে সাধ্যমতো ৫১ হাজার টাকার বেশি শোধ করেছি। রাত দেড়টায়ও ডাক্তাররা বলল রোগী ভালো আছে, বেডে দিবে। আর সাড়ে তিনটায় হঠাৎ বলে বাবা মারা গেছে। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় নয় ঘণ্টা হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় গেছি। বকেয়া টাকার জন্য বাবার লাশটা ছাড়ে নাই।
নিহতের মেয়ে রোকসানা আক্তার বলেন, আমার বাবার শুধুই প্রেসারের সমস্যা ছিল। আমরা গরিব মানুষ। মানুষের কাছ থেকে টাকা চেয়ে ৫১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু টাকার জন্য নয় ঘণ্টা ধরে আমার বাবার লাশ আটকে রাখে।
হাসিবুর রহমান রনি বলেন, একটি নামি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কীভাবে সামান্য কয়েক হাজার টাকার জন্য একটি হতদরিদ্র পরিবারের মৃতদেহ টানা নয় ঘণ্টা আটকে রাখতে পারে, তা ভাবতেও অবাক লাগে। জহিরুল ইসলাম একজন অতি দরিদ্র রিকশাচালক ছিলেন। তার ছেলে ফরিদও রিকশা চালান। গ্রামের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বজনেরা সকাল থেকে কান্নাকাটি করছিলেন। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিলের জন্য মরদেহ ছাড়ছিল না। এটি কোনো চিকিৎসাসেবা হতে পারে না; এটি মানবিকতার চরম বিপর্যয়।
তবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ডিউটি অফিসার ইউসুফ বলেন, মরদেহ আটকে রাখার কোনো বিষয় ছিল না। রোগী ভোর সাড়ে তিনটার দিকে মারা গেছেন। সকালের দিকে নিহতের স্বজনেরা বিলের বিষয়ে কথা বললে তাদের সুন্দরভাবে ডিসকাউন্ট করে সাহায্য করা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো বিলম্ব বা জিম্মি করার বিষয় ছিল না।
হাসপাতালের এডমিন ম্যানেজার মনিরুজ্জামান বলেন, রোগী মারা যাওয়ার পর তার স্বজনেরা সকালে অফিসে এসে বিলসংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলেন। পরে বড় অঙ্কের টাকা ছাড় দিয়ে প্যাথলজি ও হাসপাতালের বিল সমন্বয় শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
