logo
Advertisement

শৈশবে বিদেশ গিয়ে হারিয়ে যান ফরিদ, ২৫ বছর পর ফিরলেন দেশে

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
শৈশবে বিদেশ গিয়ে হারিয়ে যান ফরিদ, ২৫ বছর পর ফিরলেন দেশে
মানবপাচারের শিকার তুরস্ক থেকে ফেরা মোহাম্মদ ফরিদ। ছবি: সংগৃহীত

১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বিদেশে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন ফরিদ। যে শিশুটিকে পরিবার মৃত বলেই ধরে নিয়েছিল, সেই মোহাম্মদ ফরিদ দীর্ঘ ২৫ বছর পর ফিরে এসেছেন মায়ের কাছে।

Advertisement

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ার নিজ বাড়িতে পৌঁছান তিনি। ছেলেকে ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নূরজাহান বেগম।

ও বাপ, তুই হডে আছিলা! ২৫ বছর পর তোরে পাইয়্যি। কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলে কাঁদতে কাঁদতে ছেলে মোহাম্মদ ফরিদকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মা নূরজাহান বেগম।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান ফরিদ। পরে বাবা-ছেলে পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ফরিদ। দুর্ঘটনায় তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়।

এরপর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সুযোগ নিয়ে এক মানবপাচারকারী তাকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। পরে পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান ফরিদ। তবে ইউরোপে যাওয়ার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান তিনি। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। পরে তুরস্কের পুলিশ তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। নিজের ও বাবা-মায়ের নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’—এটুকু ছাড়া তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি তাকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে। এরপর শুরু হয় পরিবারের সন্ধান।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতায় উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান।

গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলানো হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কথোপকথনের একপর্যায়ে সৈয়দ আলম নিশ্চিত করেন, ফরিদের হাতে ছোটবেলা থেকেই একটি আঙুল বেশি—অর্থাৎ তার ছয়টি আঙুল রয়েছে। এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই ভাইকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ফরিদকে তার ছোট ভাই ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ব্র্যাকের সহায়তায় তারা কক্সবাজারের উখিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। শুক্রবার সকালে নিজ বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারের সদস্যরা তাকে আবেগঘন পরিবেশে বরণ করে নেন।

ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ভাইকে ফিরে পেয়ে সৈয়দ আলম বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমাদের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান জানান, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জনকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

ফরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তার ভাষায়, শুধু পরিবারের কাছে ফেরানো নয়, ফরিদ যেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সে জন্যও সহযোগিতা করা হবে।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এ টি এম মাহবুবুল করিম বলেন, মানবপাচারের ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্নভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এসব পথে মানবপাচার প্রতিরোধে আরও সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মায়ের কোলে ফিরেছেন ফরিদ। হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে এখন তার উখিয়ার বাড়িতে বইছে আবেগের বন্যা।