
সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ফরিদপুরের রাজু মাতবর (২৮)। কথা ছিল, একটি প্রতিষ্ঠানে মেকানিক্যাল শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, সেই চাকরির বদলে তাকে পাঠানো হয় রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার মৃত্যুর খবর। অথচ রাজু বেঁচে আছেন, নাকি যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, এ প্রশ্নের উত্তর এখনো জানে না তার পরিবার।
রাজুর অপেক্ষায় রয়েছেন স্ত্রী শারমিন আক্তার। তাদের আড়াই বছরের ছেলে ও এক বছরের মেয়েও জানে না, তাদের বাবার ভাগ্যে কী ঘটেছে। স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে শোক আর অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়েছেন শারমিন। একদিকে স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি, অন্যদিকে দুই সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা, সব মিলিয়ে দিশেহারা এই পরিবার।
রাজু ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার মাঝিকান্দা গ্রামের নান্নু মাতবর ও রাজিয়া বেগমের ছেলে। গত ৮ মে তিনি রাশিয়ায় যান। এরপর তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে রাজুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নান্নু মাতবর ও মা রাজিয়া বেগম। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর স্বামীর প্রকৃত অবস্থা জানতে উদ্গ্রীব শারমিন। তিনি স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
চাকরির চুক্তি, যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ
রাজুর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী কফাইবালিয়া গ্রামের প্রিন্স মাতবর ও তার ছোট ভাই রানার মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় রাজুকে রাশিয়ায় পাঠানোর চুক্তি হয়। এরমধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়। বাকি ১০ লাখ টাকা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি রাজু, এমনটাই দাবি পরিবারের। তাদের অভিযোগ, তাকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য প্রিন্স ও রানাকে দায়ী করছেন স্বজনেরা।
রাজুর বাবা নান্নু মাতুবর বলেন, ভালো চাকরি করে সংসারের অভাব দূর করবে, এই আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে গিয়ে ছেলেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর খবর পান। এখন শুনছেন, ছেলে মারা গেছেন। তাঁর দাবি, আগে ছেলের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভিডিওতে মৃত্যুর দাবি, তথ্যের সূত্র ব্যাটালিয়ন কমান্ডার
রাজুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও। গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতুল নামের রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি যুবক ভিডিওটি প্রকাশ করেন। তিনি নিজেও রাশিয়ার যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন বলে পরিচয় দিয়েছেন।
ভিডিওতে রাজুর ছবি যুক্ত করে রাতুল দাবি করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তারা আরেক বাংলাদেশি ভাইকে হারিয়েছেন, তার নাম রাজু মাতবর।
রাতুলের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজু তার পরিচিত ছিলেন। একপর্যায়ে রাজু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে চলে যাওয়ার কথা তাকে জানিয়েছিলেন। পরে ব্যস্ততার কারণে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে রাজুর ছোট ভাই তাকে বার্তা দিয়ে জানান, ১০ থেকে ১২ দিন ধরে রাজুর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
এরপর রাজুর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের ফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করেন রাতুল। তার দাবি, ওই কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলেই তিনি রাজুর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
তবে রাতুলের এই বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বাইরে রাজুর মৃত্যুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে ভিডিওতে করা দাবি এবং রাজুর প্রকৃত অবস্থা, দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার, ভিন্ন বক্তব্য রানার
রাজুর পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত প্রিন্স মাতবরের ছোট ভাই রানা। তার দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে রাজুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। রাজু নিজেই রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে যান।
রানার বক্তব্য, রাজুকে প্রতারণা করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ সঠিক নয়।
দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকলেও রাজুকে কী ধরনের কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, সেখানে পৌঁছানোর পর তার কর্মপরিস্থিতি কী ছিল এবং কীভাবে তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনী বা যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হলেন, এসব প্রশ্নের স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠেছে।
রাজু বেঁচে থাকলে ফিরিয়ে আনা, মৃত হলে মরদেহ ফেরানোর দাবি
রাজুর পরিবার এখন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর হস্তক্ষেপ চাইছে। তাদের দাবি, রাজু বেঁচে থাকলে তাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। আর মৃত্যুর খবর সত্য হলে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ তদন্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মোহাম্মদ আল ফাহাদ এশিয়া পোস্ট বলেন, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। রাজুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
