কুষ্টিয়ায় অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক: স্বাস্থ্য বিভাগের কাছেই নেই আক্রান্তের সঠিক হিসাব

কুষ্টিয়ায় অ্যানথ্রাক্স নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হলেও আক্রান্তদের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। জেলার কোথায় কতজন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, কতজন সন্দেহভাজন, কতজনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে কিংবা কতজনের রোগ নিশ্চিত হয়েছে তার কোনো সমন্বিত হিসাব নেই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে ৫ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে এক রোগী পরবর্তীতে মারা যান। আবার চলতি সেপ্টেম্বরের ২ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ জন।
অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গত দুই-তিন মাসে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। ফলে একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দাপ্তরিক নথি ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের মধ্যে চরম অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।
শুধু দৌলতপুরই নয়, ভেড়ামারা ও জেলার অন্যান্য এলাকাতেও অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে রোগী চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে জেলা পর্যায়ে এসব তথ্য একত্র করে আক্রান্ত, সন্দেহভাজন ও পরীক্ষাধীন রোগীর নির্ভরযোগ্য কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়ায় অ্যানথ্রাক্সের প্রকৃত পরিস্থিতি কী, কতজন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কতজনের রোগ নিশ্চিত হয়েছে—সেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
সরেজমিনে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৫ জন রোগী হলেন- গত ১ ফেব্রুয়ারি নাটানাপাড়ার সুফিয়া বেগম, ১৫ ফেব্রুয়ারি শেহালার আলেক, ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামপুরের শফিকুল ইসলাম এবং ১০ এপ্রিল জোয়ার্দ্দারপাড়ার বাবর আলী ও মথুরাপুরের তাসেন।
তাদের মধ্যে মথুরাপুরের তাসেন পরবর্তীতে মারা যান। তবে তার মৃত্যুর কারণ অ্যানথ্রাক্স ছিল কি না, তা নিশ্চিত করার মতো কোনো ল্যাব পরীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাসেনের স্ত্রী রঙ্গিলা খাতুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, দৌলতপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করার পর তার স্বামীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাকে রাজশাহীতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। তবে তিনিও নিশ্চিত করতে পারেননি যে তার স্বামী অ্যানথ্রাক্সেই মারা গেছেন কি না।
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া ইসলামপুরের শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, তিনি একদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। পরে বাড়িতে ফিরে ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়েছেন। তার বাম হাতের রগের ওপরে ক্ষত হয়েছিল, যা এখন শুকিয়ে গোলাকার দাগ হয়ে আছে; কোনো ব্যথা বা জ্বালাপোড়া নেই।
অপরদিকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের তথ্য বলছে ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ জন। তাদের মধ্যে ১৬ জন নারী এবং ৫ জন রোগী পেশায় কৃষক।
চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের একজন লালনগরের কৃষক দুলাল জানান, তিনি হাসপাতালে গিয়ে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন, ভর্তি হতে হয়নি। ওষুধ খাওয়ার পর তিনি এখন সুস্থ আছেন।
তবে এই ২৪ জনের মধ্যে কতজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, কতজনের অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে এবং কতজনকে কেবল উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তার কোনো পৃথক বা সমন্বিত হিসাব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ হাসপাতালে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসার তথ্য থাকলেও তাদের রোগ নির্ণয়ের পরবর্তী অবস্থা নিয়ে স্পষ্ট কোনো চিত্র নেই।
অথচ দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন গত দুই-তিন মাসে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে ১০ থেকে ১৫ জন চিকিৎসা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্সের তেমন কোনো প্রাদুর্ভাব নেই। তবে গত দুই-তিন মাসে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে ১০ থেকে ১৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার এই বক্তব্য হাসপাতালের নথির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কেবল ভর্তি রোগীর সংখ্যাই ৫ জন এবং সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ পর্যন্ত বহির্বিভাগেই চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ জন।
কুষ্টিয়ার অ্যানথ্রাক্স পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে সেখানে আক্রান্ত, সন্দেহভাজন বা পরীক্ষাধীন রোগীর কোনো সমন্বিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, মাঝে মধ্যে ভেড়ামারা ও দৌলতপুরে দু-একটি রোগী পাওয়া যায়। তবে কোনো আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) নেই।
সিভিল সার্জনের দাবি অনুযায়ী প্রাদুর্ভাব না থাকলেও দৌলতপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে একের পর এক রোগী আসার তথ্য মিলছে। এখানেই তথ্যের বড় ঘাটতি প্রকাশ পাচ্ছে। রোগী চিকিৎসা নিলেও কার রোগ নিশ্চিত হয়েছে কিংবা কারা সন্দেহভাজন, জেলা পর্যায়ে তার কোনো হিসাব রক্ষিত হচ্ছে না।
জেলায় মোট ৪১৬ জন খামারি রয়েছেন এবং গবাদিপশুর (গরু) সংখ্যা প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ। অ্যানথ্রাক্সের মতো জুনোটিক (প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত) রোগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে নিবিড় তথ্য সমন্বয় জরুরি। কিন্তু জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও তথ্যের এই গোলকধাঁধায় বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আল মামুন হোসেন মন্ডল এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলেছি, তিনিও বিস্তারিত কিছু জানেন না। দুই-তিন মাস আগের তথ্য নিয়ে আমিও বিভ্রান্ত হচ্ছি। আগেকার খবর এখন কেন আসছে? আমি নিজেও বিব্রত। আমরা কিছুই জানি না।
তিনি আরও যোগ করেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কীভাবে এই তথ্য দিলেন, তা আমি বুঝতে পারছি না। সত্যিই এমন পরিস্থিতি থাকলে তো দ্রুত গবাদিপশুকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। কিন্তু তারা সেই তথ্যও দিতে পারছে না। অবশ্য আমাদের নিয়মিত ভ্যাকসিন কার্যক্রম চালু রয়েছে।
