logo

নারায়ণগঞ্জে একের পর এক গ্যাস বিস্ফোরণ কেন

সাজিত হোসেন সজিত
সাজিত হোসেন সজিত , নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জে একের পর এক গ্যাস বিস্ফোরণ কেন
বাসায় গ্যাসের চুলায় রান্না। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ক্যান্টিনে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ক্যান্টিনের ভেতর। দগ্ধ হন ১২ জন। সহকর্মীরা আহতদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠান। ঘটনাটি ঘটে গত ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের জেরা মেঘনা ঘাট পাওয়ার প্ল্যান্টের ক্যান্টিনে।

ওই ঘটনার দুই দিন আগে ১১ মে ফতুল্লার কুতুবপুরের লাকী বাজার এলাকায় একটি ঘরের ভেতর বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনে দগ্ধ হন বাবা-ছেলেসহ চারজন। স্থানীয়দের ধারণা, দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে ছিল। কেউ হয়তো বৈদ্যুতিক সুইচ অন করতেই মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

এর একদিন আগে ১০ মে সকালে ফতুল্লার উত্তর ভূইগড়ের গিরিধারা এলাকায় একটি বহুতল ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে ঘটে একই ধরনের দুর্ঘটনা। গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট আগুনে একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হন। শিশু সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে আগুনে ঝলসে যান বাবা-মা দুজন।

শিল্পকারখানার শহর হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ প্রায় খবরের শিরোনামে জায়গা করে নিচ্ছে গ্যাস বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়। জেলার কোথাও না কোথাও ঘটছে গ্যাস লিকেজ, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ কিংবা পাইপলাইন দুর্ঘটনা।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস শেষ পর্যন্ত জেলায় গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২৮৮টি। এতে হতাহত ও দগ্ধ হয়েছেন শতাধিক মানুষ।

কুতুবপুরের লাকী বাজার এলাকার গৃহবধূ সাদিয়া আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রতিদিন গ্যাসের গন্ধ পাই। রাতে ঘুমানোর আগে ভয় লাগে। কখন যে বিস্ফোরণ হবে, কেউ জানি না। আমরা এক আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছি।

সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্রী লিজা আক্তার বলেন, অসাবধানতা বা লিকেজ পুরো পরিবার শেষ করে দিচ্ছে। চুলা জ্বালানোর সময় ভয় লাগে। আমরা নিরাপদ পরিবেশ চাই, শুধু আশ্বাস নয়।

অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে তিতাস গ্যাসের সেবায় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বহু বছরের পুরোনো। গড়ে উঠেছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের পাইপলেইনের মাধ্যমে দেওয়া অবৈধ সংযোগের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা।

ফতুল্লার কুতুবপুর এলাকার বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়, অভিযানও চলে। কয়েকদিন পর আবার সব থেমে যায়। এমন এক শহরে বাস করছি, একটি সুইচ অন করতেও ভয় লাগে। প্রতিদিন খবর শুনি কোথাও না কোথাও আগুন লেগেছে, কেউ দগ্ধ হয়েছে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, অবৈধ সংযোগ, নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার কিংবা অসচেতনভাবে গ্যাসলাইন পরিচালনার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। ধাপে-ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো প্রতিস্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের নারায়ণগঞ্জের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব কুমার সাহা বলেন বলেন, কোনো এলাকায় গ্যাস লিকেজের গন্ধ পাওয়া গেলে দ্রুত জানাতে হবে। নিজেরা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ না নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে স্থানীয় সবজি ব্যবসায়ী নাসির মিয়া বলেন, গ্যাস লিকেজের অভিযোগ অনেকবার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনার পর সবাই আসে, পরে আবার সব আগের মতো হয়ে যায়।

সচেতনতায় জোর

তিতাসের পাইপলাইনের পাশাপাশি এলপিজি (সিলিন্ডার) গ্যাসও ব্যবহৃত হয়। দুটির মাধ্যমে অনেক সময় অসতর্কতা থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, বাসা-বাড়িতে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে। এতে জমে থাকা গ্যাস দ্রুত বাইরে বের হয়ে যেতে পারে। কোনো অবস্থাতেই বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করা যাবে না। ফোন ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুর্ঘটনা রোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃপক্ষকেও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। গ্যাসলাইনের নিয়মিত তদারকি বৃদ্ধি এবং যেসব স্থানে লিকেজ রয়েছে সেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেকে গ্যাসলাইন, চুলা বা রেগুলেটরের ত্রুটি দীর্ঘ দিন অবহেলা করেন, যা পরে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিয়মিত গ্যাসলাইন পরীক্ষা, মেয়াদোত্তীর্ণ চুলা ও রেগুলেটর পরিবর্তন এবং রান্নাঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের গ্যাসচুলা থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা এবং রাতে ঘুমানোর আগে চুলার চাবি বন্ধ আছে কি না, তা নিশ্চিত করা উচিত।

তিতাস গ্যাস নারায়ণগঞ্জের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব কুমার সাহা বলেন, নারায়ণগঞ্জে তিতাসের অনেক পাইপলাইন দীর্ঘ দিন আগে স্থাপন করা হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের কারণে এসব লাইনের কিছু অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সিটি করপোরেশনের রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ বা সংস্কারকাজের সময় অনেক ক্ষেত্রে পাইপলাইনের সুরক্ষামূলক আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটির সংস্পর্শে এসে পাইপে ক্ষয় সৃষ্টি হয় এবং লিকেজের ঘটনা ঘটে।

তিনি জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো গ্যাসলাইন প্রতিস্থাপন এবং সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের দুই উদ্যোগ

পর্যালোচনা করে জেলা প্রশাসন জানতে পেরেছে–দীর্ঘ দিনের পুরোনো সঞ্চালন লাইনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা রোধে দুটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন।

প্রথম পরিকল্পনা অনুযায়ী–তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরোনো গ্যাস লাইনগুলোর উপযোগিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। কোনো লাইনে ত্রুটি বা ঝুঁকি শনাক্ত হলে তা দ্রুত মেরামত কিংবা প্রতিস্থাপনের জন্য তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

দ্বিতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী–জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে জেলার প্রতিটি উপজেলায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এতে করে গ্যাস সংক্রান্ত ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষ সতর্ক হবে এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) রায়হান কবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর থেকে বড়-ছোট মিলিয়ে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ করে বাসাবাড়িতে আগুন লাগা এবং বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, তিতাস গ্যাস জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। তবু জেলা প্রশাসক হিসেবে জেলার সব বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করা আমার দায়িত্ব। গাফিলতি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।