
নদীগর্ভে প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া একটি সাইক্লোন শেল্টার। দুর্যোগের সময় মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নির্মিত এই ভবনই হয়ে উঠেছে মা কুলসুম বেগমের আজীবন কান্নার কারণ। পাঁচ বছর আগে শেল্টার ভবনের এক অংশ ভেঙে নদীতে চাপা পড়ে নিখোঁজ হয় তার ১৭ বছরের ছেলে নেয়ামত উল্লাহ। কিন্তু আজও মেলেনি তার সন্ধান। সন্তানের মরদেহটাও না পাওয়ার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে এখনও নদীর পাড়ে ছুটে যান কুলসুম বেগম। পানি কমে পাড় জেগে উঠলেই সেই সাইক্লোন শেল্টারের কাছে গিয়ে চোখের পানি ফেলেন, তাকিয়ে থাকেন নদীর দিকে।
বারেক হওলাদারের ছেলে নেয়ামত ছিল আফছার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার রোল নম্বর ছিল ১। ওই বছরই তার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল খেলাধুলাতেও ছিল তার আগ্রহ। নিজের পড়াশোনার খরচও নিজেই চালাত এলাকায় টিউশনি করে। পাশাপাশি কৃষিকাজে বাবাকে সহযোগিতা করত। এক মেয়ে ও পাঁচ ছেলের মধ্যে নেয়ামত উল্লাহ ছিল সবার ছোট। পরিবারের সবার আদরের এই সন্তানকে ঘিরেই ছিল বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন।
২০২১ সালের ২৪ আগস্ট ঝালকাঠির দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার ভবনটি বিষখালী নদীতে ধসে পড়ে। উক্ত দুর্ঘটনায় নেয়ামত উল্লাহ নিখোঁজ হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণ করা প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ের এই ভবনটির স্থায়িত্ব ও নদীভাঙন প্রতিরোধে অবহেলার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে এখনও ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।
নেয়ামত উল্লাহর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৪ আগস্টের সেই দিনটি আজও ভুলতে পারেননি তারা কেউই। সেদিন সকাল ৭টার দিকে অন্য দিনের মতোই ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসেছিল নেয়ামত। এ সময় তার বাবা বারেক হাওলাদার তাকে পড়াশোনা শেষ করে বিলে গিয়ে ধানের চারা রোপণে সহযোগিতা করতে বলেন। পড়াশোনা শেষ করে মায়ের সঙ্গে সকালে ভাত খেয়ে বাবার কাছে বিলে যায় নেয়ামত। সেখানে ধানের চারা রোপণ করে সকাল ১১টার দিকে বাড়িতে ফিরে আসে। বাড়িতে এসে মাকে ধান উঠানে শুকাতে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই কয়েকজন সহপাঠী বাড়িতে এসে নেয়ামতকে জানায়, সাইক্লোন শেল্টারটি ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। তারা সেটি দেখতে যাবে। বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়ার সময় মাকে নেয়ামত বলেছিল, ‘মা, তোমার ধান শুকানোর আগেই আমি চলে আসব। এসে ধান ঘরে উঠিয়ে গোসল করব।’ এই কথাই ছিল মায়ের সঙ্গে ছেলের শেষ কথা। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি নেয়ামত উল্লাহ।
‘হাড্ডি-গুড্ডি পেলেও কবর দিতে পারতাম’
ছেলের মরদেহ না পাওয়ার কষ্ট আজও কুড়ে কুড়ে খায় কুলসুম বেগমকে। নদীর পানি কমে গেলে তিনি এখনও সেই সাইক্লোন শেল্টারের কাছে যান। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। যদি কোনোভাবে সন্তানের দেহাবশেষের সন্ধান মেলে—এই আশায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কুলসুম বেগম বলেন, ছেলের মরদেহ না পাইলেও আল্লাহ যদি আমাকে হাড্ডি-গুড্ডি দেখাইতো, তাহলেও হইতো। যখন সাইক্লোন শেল্টার ভেঙে নদীতে চাপা পড়ে গেছে, তখন প্রথমে উঠানোর জন্য চেষ্টা করছিল। পরে আর উঠায় নাই। তখনকার মেম্বার-চেয়ারম্যানরা বলছিল, ৮ লাখ টাকা দিলে উঠাবে। এতো টাকা মুই কোথায় পামু?
তিনি বলেন, ছেলের যদি হাড্ডি-গুড্ডি উঠাইয়া দিতো, এক জায়গায় মাটি দিতাম। তাও কবর দেখতে পারতাম, মনকে বুঝাইতে পারতাম ওইখানে আমার ছেলে আছে। কবরের পাশে গিয়ে দোয়া-কালাম পড়তে পারতাম। ছেলের কথা মনে উঠলে কলিজা ছিঁড়ে যায়। এখনও ছেলের খোঁজে পানি কমার সময় নদীর পারে ওই সাইক্লোন শেল্টারের কাছে যাই। চোখের পানি ফেলি আর তাকাইয়া থাকি- নেয়ামতের লাশ ভেসে উঠে নাকি। ছেলের জন্য মন মানে না। যখনই মনে পড়ে, তখনই নদীর পারে চলে যাই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার সময় নেয়ামত উল্লাহর পরনে ছিল হলুদ রঙের একটি গেঞ্জি ও প্যান্ট। সেই পোশাকের কথাটিও আজও মায়ের চোখে ভাসে।

বাবা বারেক হাওলাদার বলেন, ২০২১ সালের ওই দিনটার কথা মনে পড়লে এখনও বুকটা ফেটে যায়। আমার ছেলে নেয়ামত ভবন ভেঙে নদীতে পড়ার দৃশ্য দেখতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। কত জায়গায় খুঁজেছি, কত মানুষের কাছে গিয়েছি, কিন্তু ছেলের কোনো সন্ধান পাইনি। তার লাশটাও পেলাম না। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?
তিনি বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করি, আমার ছেলে হয়তো কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসবে। এই আশাতেই বেঁচে আছি।
সাইক্লোন শেল্টারটি কেন নদীতে ভেঙে পড়ল, এ প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়ায় এই পরিবারকে। বারেক হাওলাদার বলেন, যে সাইক্লোন শেল্টারে মানুষ নিরাপদে থাকবে, সেই ভবনই যদি ভেঙে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তাহলে এর দায় কার? আগে থেকেই যদি নদীর ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে হয়তো আমার ছেলেকে হারাতে হতো না।
কুলসুম বেগম বলেন, আমার ছেলে সেদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় কি জানত, আর কোনোদিন সে মায়ের কাছে ফিরে আসবে না? এখনও আমার চোখের সামনে ছেলের মুখটা ভাসে। প্রতিদিন মনে হয়, দরজা দিয়ে হয়তো আমার ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু পাঁচ বছর হয়ে গেল, সে আর ফিরল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, তার লাশটাও পেলাম না যে অন্তত কবর দিয়ে একটু শান্তি পাব। আমার ছেলের জন্য একটা কবরও নাই। আমি কোথায় গিয়ে তার জন্য দোয়া করব?”
ইমারজেন্সি সাইক্লোন রিকভারি অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্টের আওতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পশ্চিম দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে ভবনটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয় ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু নির্মাণের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনটি বিষখালী নদীর ভাঙনের মুখে পড়ে।
নেয়ামত উল্লাহর মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও ওই এলাকার নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। পরিবারের দাবি, যে স্থানে সাইক্লোন শেল্টারটি নদীতে ভেঙে পড়েছিল, সেখানে দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো অপসারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
পোনাবালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ৩টি গ্রামের মানুষের আশ্রয় কেন্দ্র ছিল এটি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সাইক্লোন শেল্টারটি অতি ঝুকিপূর্ণ। সাইক্লোন শেল্টারের অর্ধেক ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে তখন নেয়ামত উল্লাহ নামে একটা ছেলে চাপা পড়ে নিখোঁজ হয়। তখন তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওই সব এলাকা নদীতে ভেঙে যাচ্ছে। সরকারের কাছে আবেদন বন্যয় যাতে এই ৩ গ্রামের মানুষের আশ্রয় নিতে পারে তাই সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করে দেওয়া হোক এবং নদীর ভাঙন রক্ষায় বেড়িবাঁধ করে দেওয়া হোক।
শেল্টার মেরামতের বিষয়ে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা বলেন, দেউরি সাইক্লোন শেল্টারটি নদীগর্ভে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। জেলায় প্রায় ২২ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাবিত রয়েছে। ওই প্রকল্পের মধ্যে সাইক্লোন শেল্টার এলাকাটিও রয়েছে। ওই অংশে কাজ করার সময় ঝুঁকিপূর্ণ সাইক্লোন শেল্টারটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অনুরোধ জানানো হবে।
