
একদিকে ১৭৩ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর হাসিমুখ ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে ২৫ শিক্ষক-কর্মচারীর অনিশ্চিত জীবন। বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করেও তাদের অপেক্ষার অবসান হচ্ছে না। সরকারি স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির আশায় দিনের পর দিন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি। এভাবেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ঝামারঘোপ বিশেষ শিক্ষা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়।
২০১৪ সালে লাহুড়িয়া ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে আসছে। প্রায় ২০ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ১৭৩ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের রয়েছে সুবর্ণ কার্ড। তবে সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা রয়েছে, তেমনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার জন্য রয়েছে নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থা। প্রতিদিন দুপুরে শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয় টিফিনের ব্যবস্থাও। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, সামাজিকীকরণ ও আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে কাজ করছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রইচ উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনায় বিদ্যালয়ে ২৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। ফলে বিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন এবং শিক্ষার্থীদের পরিবহন ও টিফিনের ব্যবস্থা চালিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নানা সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী আগে ঘরবন্দি জীবন কাটালেও বিদ্যালয়ে এসে এখন নিয়মিত পড়াশোনা করছে, সহপাঠীদের সঙ্গে মিশছে এবং বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু সরকারি স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি না থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবিকা নির্বাহেও চরম সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কাজ করছি। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারছি না। কিন্তু পরিবার-পরিজন নিয়ে আমাদেরও জীবনযাপন করতে হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়টিকে স্বীকৃতি দিয়ে এমপিওভুক্ত করা হলে শিক্ষক-কর্মচারীরা আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন। এতে আরও উৎসাহ নিয়ে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তবে স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, আর্থিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাই।
স্থানীয়দের মতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রত্যন্ত এলাকার যেসব পরিবার সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল, তাদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। অনেক অভিভাবক জানান, বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাদের সন্তানদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, শিক্ষকদের নির্দেশনা অনুসরণ করছে এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ শেখার চেষ্টা করছে।
স্বপন শিকদার নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের জন্য আগে তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। বিদ্যালয়টি চালু হওয়ায় তারা পড়াশোনা করার পাশাপাশি অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে পারছে। শিক্ষকরা অনেক যত্ন নিয়ে পড়ান। কিন্তু বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি না পাওয়ায় আমরা সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি স্বীকৃতি ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। এতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, উন্নত অবকাঠামো তৈরি এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা কোনো দয়া বা অনুদানের বিষয় নয়। এটি তাদের মৌলিক অধিকার। তাই দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কাজ করা শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত বিদ্যালয়টির সরকারি স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে একদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও আরও নিরাপদ হবে।
১৭৩ শিশুর স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষক-কর্মচারী।
