‘দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটার মৃত্যু মানতে পারছি না’

‘কত আশা করেছিলাম, ফুটফুটে একটি শিশু আসবে। সেই শিশুর হাসি-খুশিতে সংসার ভরে উঠবে। কিন্তু একসঙ্গে শাশুড়ি, দেবর, দেবরের মেয়ে ও পাঁচ বছরের নাতিকে হারাতে হলো। পেটে থাকা শিশুটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেল।’ ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজনকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন নিহত মোফাজ্জল হোসেনের ভাবি ইসমতারা।
শনিবার (৩ অক্টোবর) এশিয়া পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসমতারা বলেন, ‘একসঙ্গে এত আপন মানুষ হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। পেটে থাকা ছোট্ট শিশুটিও কোনো অপরাধ না করেই পৃথিবীতে আসার আগেই চলে গেল। দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটার মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কত আশা করেছিলাম, সেই ছোট্ট শিশুটিকে কোলে নিয়ে আদর করব, তার মুখের হাসি দেখে সব দুঃখ ভুলে যাব। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার ওপর তো কারও হাত নেই।’
নিহত মোফাজ্জল হোসেনের ছোট ভাই মোবারক হোসেন বলেন, মোফাজ্জল স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গাজীপুরের হুতাপাড়া এলাকায় থাকতেন। শুক্রবার সকালে মাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাড়িতে আসেন। এ সময় তার মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনানও তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। পরে তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে বেলা ১১টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন মোফাজ্জল।
তিনি আরও বলেন, নান্দিনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রথমে ময়মনসিংহ এবং পরে বাসে করে গাজীপুর যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা। বাসচালককে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর বাসচালক পালিয়ে গেছেন। তাকে গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া বাইপাস সড়কের গন্দ্রপা এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা জামালপুরগামী রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর আকুয়া বাইপাস সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে প্রায় এক ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক করে। রাত ১০টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সাতজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহত সাতজনই জামালপুর জেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন হলেন জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর গ্রামের রাশিদা বেগম (৭০), তার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন (৫০), মোফাজ্জলের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) এবং মর্জিনার ছেলে মিনান (৫)। নিহত অন্য তিনজন হলেন একই উপজেলার বীর গোবিন্দপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. সুজন আলী (৪৪) এবং বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী (৫১) ও তার স্ত্রী মমতা বেগম (৩৯)।
শুক্রবার রাতে জামালপুর শহরে রাজীব পরিবহনের প্রতীকী মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ ও গায়েবানা জানাজা করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার পর শনিবার সকালে পৃথক জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঢাকা-জামালপুর রুটে চলাচলকারী রাজীব পরিবহনের বাসগুলো অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চলাচল করে। এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে বলেও তারা অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বাসচালককে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়েছে। বাসের চালক ও তার সহযোগীরা পালিয়ে গেছেন। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মোবারক হোসেন লিখিত অভিযোগ দেন। পরে রাত ১২টার পর অজ্ঞাতনামা বাসচালকের বিরুদ্ধে সেটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ফায়ার সার্ভিসের ময়মনসিংহ স্টেশন অফিসার মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন মিলে অটোরিকশার ভেতর থেকে নিহতদের উদ্ধার করেন। অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে বলে তার ধারণা। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ময়মনসিংহ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আনিসুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিআরটিএর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে। একই পরিবারের সদস্য হলেও ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য পৃথকভাবে এই সহায়তা দেওয়া হবে। এ জন্য নির্ধারিত ফর্মে আবেদন করতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়া সহজ ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় দেড় শতাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ১৪৩ জন নিহত ও প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন।
