
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, করতোয়া, বাঙালি ও ঘাঘট নদীবেষ্টিত গাইবান্ধা জেলা। এ জেলায় প্রতিবছরই বিভিন্ন নদীগর্ভে বিলীন হয় শত শত বিঘা কৃষিজমি, বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জেলার সাঘাটা উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত হলদিয়া ইউনিয়নও দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের শিকার। গত ১০ বছরে এই ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ এলাকা যমুনাগর্ভে বিলীন হয়েছে। কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল কয়েক দফা সরিয়ে নেওয়ার পরও হুমকিতে রয়েছে শত শত পরিবার।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস’-এ ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণায় দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যমুনার গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্র ভাঙনে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার প্রায় ২০ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতখালী, সাঘাটা, হলদিয়া, কামালেরপাড়া ও মুক্তিনগর ইউনিয়ন। একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়ে এসব এলাকার হাজারো পরিবার তাদের সামাজিক অবস্থান, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় গাইবান্ধা জেলার তীব্র ভাঙন পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
সিইজিআইএসের তথ্যমতে, ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৩ হেক্টর (১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার) জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, যা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্মিলিত আয়তনের প্রায় পাঁচ গুণ। এই সময়ে নদীতে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার নতুন চর জেগে উঠলেও নিট ভূমি ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার। মোট ক্ষয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই একা গ্রাস করেছে যমুনা।
সাঘাটা উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত নলছিয়া গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মানুষের মধ্যে এখনো নদীভাঙনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভাঙন প্রতিরোধে ব্লক ও জিওব্যাগ ফেলার পরও তাদের মধ্যে শঙ্কা কাটেনি। তাদের আশঙ্কা, এসব কাজের পরও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে যাবে।

সাঘাটার নলছিয়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী আইদুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের ফলে আমি খুব বিপদে আছি। নদীভাঙন প্রতিরোধে সরকারি কাজ চলছে। কিন্তু আমাদের ভয় হয়, এই কাজের মাধ্যমে কতটা নিরাপদ থাকতে পারব।
সাঘাটার হলদিয়া ইউনিয়নের কাজলী আক্তার নামের এক নারী বলেন, রাত হলে ভয় হয়। ঘুমাতে পারি না। কখন যেন নদীগর্ভে বিলীন হই। কারণ এই যমুনা নদী ছিল এখান থেকে আরও ১০ কিলোমিটার পূর্বে। এখন সেই যমুনার ভাঙনে আমাদের ইউনিয়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে। জানি না কী হবে।
স্কুলছাত্র মাহবুর রহমান বলেন, আমি একসময় গোবিন্দপুর উচ্চবিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতাম। স্কুলটির পাকা ঘর যখন নদীগর্ভে বিলীন হলো, তখন থেকেই আমার লেখাপড়া আর করা সম্ভব হয়নি।
হলদিয়া ইউনিয়নের মমিম মিয়া বলেন, যদি অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ না হয়, তাহলে নদীভাঙন রোধ হবে না। কারণ যতই সরকারি ভাবে নদীভাঙন রোধে কাজ করা হোক, যদি অবাধে বালু বিক্রি করা হয়, তাহলে নদীর তলদেশের বালু সরিয়ে আবারও নদীভাঙনের সৃষ্টি হবে।
হলদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী বলেন, যমুনা নদীর ভাঙনে হলদিয়া ইউনিয়নের ৮০ ভাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়িহারা হয়েছে। সরকার যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজ শেষ করে, হয়তো এই ইউনিয়নের ২০ ভাগ মানুষ টিকে থাকতে পারবে।
সাঘাটা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু বলেন, আজ থেকে ৮-১০ বছর আগে যখন আমি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন আমাদের কাছে জনগণের একটাই দাবি ছিল—নদীভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা। আমরা ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার কাছে গিয়ে আমাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছি। পরে সরকারি ভাবে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামীতে নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজ শেষ হওয়ার পরে হয়তো কাউকে আর ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে কাঁদতে হবে না।
একই চিত্র জেলার আরও কয়েকটি উপজেলায়। প্রতিবছর নদীভাঙনের ফলে দিশেহারা হয়ে পড়ছে হাজার হাজার পরিবার। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীর করাল গ্রাসে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ফুলছড়িতেও একই চিত্র। এই উপজেলায়ও প্রায় ১০টি স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহেও ফুলছড়িতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। তারা ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের হাত থেকে মুক্তির জন্য সরকারি সহযোগিতা চেয়েছেন।
এ ছাড়া গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাঙালি নদীতেও দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। এই উপজেলার আটটি পয়েন্টে নদীভাঙনের ফলে স্থানীয়রা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ভাঙন রোধে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাটের অবস্থাও একই। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে এখানে নদী ভাঙছে। ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে তারা অনেকবার অভিযান পরিচালনা করেছেন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা ও উন্নয়ন গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, নদীভাঙন এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে পুরোপুরি তছনছ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জের মতো জনপদে শুধু জরুরি ভিত্তিতে কিছু জিওব্যাগ ফেলা বা সাময়িক ত্রাণ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।

তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি, পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম সতর্কতা, স্থানান্তরিত পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বজায় রাখা, জমি ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলের নিরাপত্তা এবং বিকল্প জীবিকায়ন ও পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপর জোর দেন।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ কুমার দাস জানান, এক বছরে গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন নদীর ভাঙনে আটটি স্কুল নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখনো হুমকিতে রয়েছে সদর উপজেলার মোল্লার চর তেতুলিয়া দিঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাঘাটা উপজেলার সিপি গাড়ামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চর কাপাসিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর কাপাসিয়া ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলছড়ি উপজেলার চর হরিচণ্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সন্ন্যাসীর চর প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য বিদ্যালয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ভাঙনকবলিত সাঘাটার কয়েকটি স্থানে কাজ চলমান রয়েছে। কোথাও নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজের ব্যাংক লাইন ডিজাইনের বাইরে যাতে সরে না যায়, সেজন্য ঠিকাদার নিজ দায়িত্বে সাময়িকভাবে সিসি ব্লক প্লেসিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভাঙনকবলিত স্থানটি ডিজাইন অনুযায়ী যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে। এর জন্য অতিরিক্ত কোনো ব্যয় হবে না। এ ছাড়া ভাঙন রক্ষার্থে পর্যাপ্ত সিসি ব্লক মজুদ রয়েছে। এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
তিনি বলেন, নতুন করে যেসব স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে, আমরা জিওব্যাগ ফেলার মাধ্যমে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছি। নতুন কোনো বরাদ্দ নেই, তাই স্থায়ী কাজ করতে পারছি না।
