logo
Advertisement

জামালপুর/২৯ লাখ টাকার বাঁধ টিকল ২৯ দিন

২৯ লাখ টাকার বাঁধ টিকল ২৯ দিন
ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের ৪ নম্বর চর নতুনপাড়া গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ফেলা জিও ব্যাগের বাঁধে ধস। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সরকারের খাতায় প্রকল্পের নাম ‘আপৎকালীন জরুরি প্রতিরক্ষা’। দরপত্রের চূড়ান্ত খরচ ২৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। আর স্থায়িত্ব? মাত্র ২৯ দিন। জামালপুরের ইসলামপুরের ব্রহ্মপুত্র নদে ৭ হাজার ২০০টি জিও ব্যাগ ফেলে কীভাবে সরকারি অর্থ অপচয় করা হয়েছে, তা বুঝতে পুরো এক মাসও অপেক্ষা করতে হয়নি।

গত ২০ আগস্ট সকালে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে নদের পেটে তলিয়ে গেছে এই প্রতিরক্ষা বাঁধের ২০ মিটার অংশ। এর কিছুদিন আগে ধসে গিয়েছিল আরও ১০ মিটার। এক মাস না যেতেই বাঁধের এই দুই স্থানে নতুন করে ধস নামায়, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি করে আবারও অতিরিক্ত জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। কাগজে-কলমে এটি নদীভাঙন রোধের প্রকল্প হলেও বাস্তবে তা দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অপরিকল্পিত উদ্যোগ ও তদারকহীনতার এক চরম নমুনা।

সরেজমিনে ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের ৪ নম্বর চর নতুনপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে, তার কয়েক মিটারের মধ্যেই বসানো হয়েছে শক্তিশালী ড্রেজিং মেশিন। নদী খননের নামে সেখান থেকে দিনরাত তোলা হচ্ছে বালু।

প্রকৌশলবিদ্যার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নদীর পাড় ঘেঁষে গভীর তলদেশ থেকে বালু তুললে তীরের মাটির স্বাভাবিক ভারবহন ক্ষমতা শূন্যে নেমে আসে। একদিকে পাউবোর ঠিকাদার ওপর থেকে বালুর বস্তা ফেলছেন, অন্যদিকে ড্রেজারের পাইপ দিয়ে নদের তলদেশের মাটি খালি করা হচ্ছে। ফলে বস্তা ফেলার কয়েক দিনের মধ্যেই তলদেশের মাটি ধসে তা গিলে খাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জিও ব্যাগ ফেলা ও পাশে ড্রেজার বসানোর মতো দুটি প্রক্রিয়ার সমন্বয়হীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে গোটা এলাকাকে। বাঁধ ধসলে আবার নতুন বরাদ্দ আসবে, আবারও ফেলা হবে জিও ব্যাগ। এতে নদের ভাঙন না কমলেও কারসাজি থামছে না।

ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে থাকা চর নতুনপাড়ার বাসিন্দারা পাউবোর এই পুরো প্রকল্পকে পরিকল্পিত অপচয় বলছেন। চরের শত শত পরিবার এখন ঘরবাড়ি সরানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

চরের প্রবীণ বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ মানেই নদী ভাঙবে আর ওনাদের পকেট ভরবে। নদীর একদম পেটের ভেতর ড্রেজার চালিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। নিচের মাটিই যদি সরে যায়, তবে জিও ব্যাগ পানি ঠেকাবে কীভাবে? আমাদের দরকার স্থায়ী বাঁধ, বস্তা ফেলার এই ভেলকিবাজি আমরা আর চাই না।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিমের অভিযোগ, ঠিকাদারের লোকজন যখন বস্তা ফেলছিল, তখন পাউবোর কোনো তদারকি কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। নিম্নমানের বস্তায় নদীর ড্রেজিং করা বালু ভরে কোনোমতে ডাম্পিং করে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। এই অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।

২৯ দিনের মাথায় ধস নামার পর দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে সব পক্ষ থেকে। সব অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স একরামুল হক খানের স্বত্বাধিকারী একরামুল হক খান বলেন, কাজটি যথাযথভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছে। জিও ব্যাগের মান ও বালুর গুণগত মান নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। অফিসের কর্মকর্তা, প্রশাসনের প্রতিনিধি ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতেই ব্যাগ গণনা করে ডাম্পিং করা হয়েছে। তবে আমার ধারণা, নদী খননের ফলে তলদেশে গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির স্রোত বেড়ে গেছে। সেই কারণেই পাড়ের কিছু অংশ ধসে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখানে যে পরিমাণ জিও ব্যাগ বরাদ্দ ছিল, তা ভাঙনের ঝুঁকির তুলনায় কম ছিল। আরও বেশি ডাম্পিং করা গেলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতো।

তবে কাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ব্রহ্মপুত্রে যে ড্রেজিং হচ্ছে, সেখানকার ঝালরচরে নদের মুখটা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক দিন পর এখানে পানির প্রবাহ বেশ বেড়ে গেছে এবং বাঁকে বাঁকে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। আর আমাদের ইমার্জেন্সি ডিজাইনগুলো সাধারণত বেশি খরচে করা হয় না, সর্বনিম্ন খরচে উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করা হয়। কাজ চলাকালীন এবং শেষের দিকে কিছু অংশ দেবে গিয়েছিল, যা ঠিকাদার পুনরায় ঠিক করে দিয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকার টাস্কফোর্স এবং স্থানীয় ইউএনওর প্রতিনিধিসহ সবাই কাজের মান ও বস্তার পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাই কাজ নিম্নমানের হওয়ার অভিযোগটি ঠিক নয়।