logo

ঢাকার সরকারি স্কুলে এক কক্ষেই ৩ শ্রেণির ক্লাস, নেই নিরাপদ পানি-শৌচাগার

ঢাকার সরকারি স্কুলে এক কক্ষেই ৩ শ্রেণির ক্লাস, নেই নিরাপদ পানি-শৌচাগার
পরিত্যক্ত একটি টিনশেড রুমে একসঙ্গে চলে তিন শ্রেণির ক্লাস। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একটি মাত্র ছোট কক্ষে চলছে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান। মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে। নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, শৌচাগার কিংবা শিশুদের খেলার মাঠ। সামান্য বৃষ্টিতেই টিনের চাল চুইয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় শ্রেণিকক্ষ। পুরান ঢাকায় ৫৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর নিয়মিত চিত্র এটি।

১৯৪০ সালে ‘জগদীশ চন্দ্র দাসের পাঠশালা’ নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ করে নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

পুরান ঢাকার ৬৩ নম্বর পরীদাস রোডে বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। ২০২০ সালে ভবনের ছাদ ধসে পড়ার পর সেখানে পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। আইনি জটিলতার কারণে মূল ভবনে ফিরতে না পেরে বর্তমানে ৪৯ নম্বর হেমচন্দ্র দাস রোডের একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম।

বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫৯ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। জায়গা সংকটের কারণে দুই শিফটে চলে পাঠদান।

প্রথম শিফটে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শিফটে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস হয়। দ্বিতীয় শিফটে একই কক্ষে তিনটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পড়ানো হয়।

পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে বসতে হয়। এতে ক্লাসে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রিদ্ধিমান রায় চৌধুরী বলেন, আমাদের এখানে একসঙ্গে তিনটি শ্রেণির ক্লাস হয়। ম্যাম যখন একটি ক্লাসকে পড়ান, তখন অন্য ক্লাসের পড়াশোনায় সমস্যা হয়। বৃষ্টি হলে টিনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কিছুদিন আগে পানির কারণে ফ্যানও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে সেটা ঠিক করা হয়েছে, আর স্যার একটি নতুন ফ্যানও এনে দিয়েছেন।

আমাদের কোনো ওয়াশরুম নেই। একজন আঙ্কেলের সহযোগিতায় একটি ওয়াশরুম ব্যবহার করি। পরিষ্কার ও ভালো একটি ওয়াশরুম থাকলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।

আমাদের শিক্ষক মাত্র তিনজন। আরও শিক্ষক ও ভালো একটি ভবন দরকার। বৃষ্টির পানি যেন না পড়ে, সরকার যদি ভবন ও টিনগুলো ঠিক করে দেয়, তাহলে আমরা ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারব।

পরিত্যক্ত একটি টিনশেড রুমে একসঙ্গে চলে তিন শ্রেণির ক্লাস। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পরিত্যক্ত একটি টিনশেড রুমে একসঙ্গে চলে তিন শ্রেণির ক্লাস। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এক কক্ষে তিনটি শ্রেণির ক্লাস হওয়ায় বেঞ্চেরও সমস্যা হয়। আরও বেঞ্চ ও ভালো পরিবেশ পেলে আমরা শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারতাম।

এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মির্জা নুরুন্নাহার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এই বিষয়য়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অদিতি দাস বলেন, ‘আমি কিছু বলতে পারব না, আমাকে নিষেধ করা আছে। আপনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জানতে পারেন।’

অনুরোধের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল ভবনটি জরাজীর্ণ ও মামলা জটিলতায় পড়ে আছে। তাই এখন অস্থায়ী একটি টিনশেড কক্ষে ক্লাস নিতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে টিন চুইয়ে পানি পড়ে পুরো কক্ষ ভিজে যায়। বাচ্চাদের বসার জায়গা থাকে না, আমাদেরই পানি সরাতে হয়। টয়লেটেরও ব্যবস্থা নেই। তার ওপর একটি কক্ষে একসঙ্গে তিনটি শ্রেণির ক্লাস হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।’

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমরা শুধু চাই, বাচ্চাদের মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ ও পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ। দরিদ্র পরিবারের এসব শিশুর অনেকেরই এই বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই। তাদের এই কষ্ট আর দেখতে চাই না। দ্রুত একটি ভালো ভবন হলে শিশুরা একটু স্বস্তিতে পড়াশোনা করতে পারবে।’

পুরোনো ভবনের মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে মামলা চলছে। ইতোমধ্যে সম্পত্তিটি ঢাকা জেলা প্রশাসকের নামে নামজারি করা হয়েছে। বিষয়টি এখন হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।