logo

চিকিৎসক সংকটে ধুঁকছে রাবি মেডিকেল সেন্টার, সেবা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা

চিকিৎসক সংকটে ধুঁকছে রাবি মেডিকেল সেন্টার, সেবা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা
ছবি : সংগৃহীত

ক্লাসের চাপ, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা কিংবা আবাসিক হলের অনিয়মিত জীবনযাত্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তখন শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার। কিন্তু সেই সেন্টারেই চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পরিচালনার জনবল ঘাটতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে ধুঁকছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। ৩০ হাজারের বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে নেই পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও। ফলে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীকে সীমিত জনবল নিয়েই সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মরত চিকিৎসকদের।

আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারেরও বেশি নারী শিক্ষার্থী থাকলেও মেডিকেল সেন্টারে নেই কোনো গাইনোকোলোজিস্ট। জরুরি বিভাগেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক।

অন্যদিকে, ডিজিটাল এক্সরে ও ইসিজি মেশিন থাকলেও দক্ষ টেকনোলজিস্ট ও বিশেষজ্ঞের অভাবে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহারও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে দীর্ঘ অপেক্ষা, ওষুধ সংগ্রহে ভোগান্তি আর কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার হতাশা দিন দিন বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

গত বছরের ১৭ জুলাই ডেঙ্গুতে বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী মারা গেলে শিক্ষার্থীরা মেডিকেল সেন্টারের নাম দেন ‘নাপা সেন্টার’। এর প্রতিবাদে সেসময় তারা প্যারিস রোডে মানববন্ধন করে এবং সেন্টারে ‘নাপা সেন্টার’ লেখা সম্বলিত একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেন।

প্রতিষ্ঠার প্রায় ৭ দশক পেরোলেও যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কখনোই পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। জুলাই বিপ্লবের পর অ্যাডহকে ৫ জন চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তাদের মধ্যে একজন বিসিএসে সুযোগ পেয়ে চলে যান। বর্তমানে তাদের ৫ জন রয়েছেন। এ ছাড়া অবসরে যাওয়া দুই চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে রাবি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৬টি। কিন্তু এই স্বল্প পদের বিপরীতেও চিকিৎসক আছেন মাত্র ১৪ জন। অবসরে যাওয়া দুই চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক, একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অ্যাডহকে নিয়োগ দেওয়ায় চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। মোট ৩৬টি পদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৫ পদই পড়ে রয়েছে ফাঁকা।

অন্যদিকে সেন্টারে দুজন পুরুষসহ মোট ছয়জন নার্স থাকার কথা থাকলেও যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তা দুজনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ছয়জনের বিপরীতে রয়েছেন তিনজন। নাক-কান-গলা, মনোরোগ, অর্থোপেডিক ও গাইনোকোলোজিস্ট কোনো চিকিৎসক নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, মেডিকেল সেন্টারটিতে নেই কোনো মাইক্রো বায়োলোজিস্ট, পেশেন্ট বেড বা পর্যাপ্ত অক্সিজেন চ্যানেল। একটি ইসিজি মেশিন আছে, তবে সেটা পরিচালনা করার জন্য একজনও স্পেসালিস্ট নেই। সম্প্রতি ইমারজেন্সি সেকশন থেকে একজন স্টাফকে এনে ইসিজি মেশিনটি সচল রাখা হলেও বন্ধ রয়েছে সেবা। ডিজিটাল এক্সরে মেশিন থাকলেও সেটা পরিচালনার জন্য পূর্ণকালীন টেকনোলোজিস্ট নেই।

এ ছাড়া মেডিকেল সেন্টারটিতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলেও কোনো প্যাথলজি ডাক্তার নেই। শিক্ষার্থীরা যখন সেবা নিতে আসছেন প্যাথলজি ডাক্তার না থাকায় শুধুমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ রাখছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।

প্রায় ৩০ হাজার বেশি শিক্ষার্থীর সেবাদানের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা মোট চারটি। এর মধ্যে একটি ব্যবহার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে বিপুল সংখ্যক এই শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র চারটি অ্যাম্বুলেন্স পর্যাপ্ত নয় বলে জানায় মেডিকেল সেন্টার সংশ্লিষ্টরা।

ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে সেবা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের দাবি, সাধারণ কিছু ওষুধ সবাইকেই দেওয়া হয়। অধিকাংশ সময়ই যথাযথ ওষুধ পান না তারা। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে খেলতে যেয়ে আঘাত পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গেলে তারা নাম মাত্র চিকিৎসা চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে রেফার্ড করে দেওয়া হয়। এদিকে প্রতিবছর একেকজন শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফি বাবদ গুনতে হয় ১০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের দেওয়া মোট এই অর্থের সংখ্যাটা কম নয়।

অভিযোগ জানিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, দেশের ‎দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ক্যাম্পাসের একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রটির অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও শোচনীয়। প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে এখানে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য সামান্য অসুস্থতাতেও শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ছুটতে হয়, যা আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করে।

তিনি আরও বলেন, এমনকি গভীর রাতে কোনো শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া বা জরুরি প্রাথমিক সেবা পাওয়ার ন্যূনতম সুব্যবস্থাও এখানে নেই। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করতে মেডিকেল সেন্টারটির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। তাই শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকল্পে অবিলম্বে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু এবং মেডিকেল সেন্টারকে ৫০ শয্যায় রুপান্তর করে, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ডাক্তার বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রশিদ আবিদ বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের দুর্ভোগ ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের। চিকিৎসক থাকলেও নেই তেমন কোনো উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। যার ফলশ্রুতিতে গত মাসে রক্তাক্ত অবস্থায়ও চিকিৎসা মেলেনি এক শিক্ষার্থীর। সেখানকার চিকিৎসদের পরামর্শের সিংহভাগ ওষুধ ক্রয় করতে হয় বাইরে থেকে। যার কারণে শিক্ষার্থীদেরও মাঝেমধ্যে গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও ভারী চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ মেডিকেলের চিকিৎসকগণ। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে প্রশাসনকে বলতে চাই, রাবি মেডিকেল সেন্টারের এই অব্যবস্থাপনা দ্রুতই সমাধান করা হোক। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা বরাবরের ন্যায় এই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থেকেই যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শূন্য ১৮টি পদের বিপরীতে ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর চিকিৎসক পদে ১৩ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে তাদের মৌখিক পরীক্ষা না হওয়ায় নিয়োগ কার্যক্রম আটকে আছে। এদিকে বিগত সরকারের পতন হলে কর্তব্যরত আরও চারজন ডাক্তার পদত্যাগ করেন। এতে বর্তমানে শূন্য পদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ জনে। সবশেষ একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অ্যাডহকে নিয়োগ দেওয়ায় বর্তমানে শূন্য পদসংখ্যা ১৫টি।

সার্বিক বিষয়ে রাবি মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমাদের মেডিকেল সেন্টারে জনবল সংকট অনেক বড় একটি বাধা ছিল। বহুদিন পর কয়েকজনকে পেয়েছিলাম তার মধ্যে থেকে দুজন চলে গেলেন। শিক্ষার্থীরা খালি অভিযোগ করে যে তারা সেবা পায় না। মেডিকেলে লোকই নাই তারা সেবাটা পাবে কীভাবে। দিনে ৩টা মাসে ৯০টা শিফট এই জনবল দিয়ে সম্ভব হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গেলে বারবার তারা শুধুমাত্র আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

তিনি আরও বলেন, এই প্রশাসন আসার পর আমি বারবার তাদের কাছে গিয়েছি, আমাদের সমস্যার কথা বলেছি। তারা যে খুব বেশি কিছু করছেন সেটা বলার সুযোগ নেই। একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছে প্রশাসন। অবসরে যাওয়া আমার দুই সহকর্মী চুক্তিতে আবারও জয়েন করেছেন। তবে এটি যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়। এখনও আমাদের একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন শতাধিক রোগী দেখতে হয়। ইমারজেন্সি রুমে ২৪ ঘণ্টা যদি সিস্টার, ব্রাদার রাখা যায় তাহলে ডাক্তারের প্রেশারটা অনেকটা কমে আসবে। কিন্তু এই চাহিদাটা কিছুতেই পূরণ হচ্ছে না। আমি প্রশাসনকে বলব তারা যেন দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দিন বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর মেডিকেলের অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল ছিল, অনেকে আর্লি রিটায়ারমেন্ট করেছেন, কারও নরমাল রিটায়ারমেন্ট হয়েছে কেউবা পালিয়ে গেছেন। এমন অবস্থায় আমরা প্রথমে একজন ও পরে ৫ জনকে অ্যাডহকে নিয়োগ দিয়েছিলাম। এ ছাড়া আমরা ওষুধের জন্য কমিটি করে সেটার বাজেট বাড়িয়েছি। কিছু যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়া হয়েছে। কিছু ডেকোরেশন ও করা হয়েছে। তখন আমরা বিজ্ঞাপন দিয়ে নিয়োগ দিতে পারিনি।

পূর্নাঙ্গ মেডিকেল তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আসলে লং টার্ম প্লান, এখন শর্ট টার্ম প্লানে যেটুকু সুবিধা দিলে অর্থাৎ জনবল সংকটের বিশাল একটা ঘাটতি আছে সেটা পূরণ করতে পারলে আমার মনে হয় যে উদ্দেশ্য মেডিকেল করা তার উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব হবে। বর্তমান উপাচার্য বলেছেন সবার আগে যেন মেডিকেলে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটা যেহেতু জরুরি সেবা।

মেডিকেলে নিয়োগ নিয়ে সবার আগে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।