এসএসসির উত্তরপত্র যাচাইয়ে রেকর্ড আবেদন, নেপথ্যে যেসব কারণ

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় গত ১০ আগস্ট। প্রাপ্ত ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ বা চ্যালেঞ্জের জন্য আবেদন করেছে। এতে তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড। নির্ধারিত সাত দিনে ৪ লাখ ২৫১ জন শিক্ষার্থী মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর পরিবর্তনের আবেদন করেছে। বোর্ড-ভিত্তিক সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। যা গত বছরের চেয়ে সাড়ে ৫ লাখ বেশি।
আবেদনের মধ্যে তত্ত্বীয় (লিখিত) বিষয়ে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক বিষয়ে ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি। একজন শিক্ষার্থী গড়ে তিনটি বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, এবার পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে বড় কারণ হলো চলতি বছর পুনর্নিরীক্ষণের ধরন পরিবর্তন।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এবার পরীক্ষার খাতা শুধু প্রচলিত অর্থে পুনর্নিরীক্ষণ করা হবে না, বরং পুরো উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হবে। এ জন্য পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট পরিবর্তন করা হয়েছে। তার এই বক্তব্যের পর কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীরা প্রাপ্ত নম্বর পুনরায় যাচাইয়ের আবেদন বেশি করেছে।
এ ছাড়া চলতি বছর পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়া, খাতা মূল্যায়নে আগের তুলনায় কঠোরতা, সহানুভূতির নম্বর দেওয়ার প্রচলন বন্ধ করাও অন্যতম কারণ।
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত বছর এই হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজারেরও বেশি।
সবচেয়ে বেশি আবেদন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে
বোর্ড-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে তত্ত্বীয় বিষয়ে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক বিষয়ে ৫৮ হাজার ১২টি—মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৭টি আবেদন পড়েছে।
এ ছাড়া কুমিল্লা বোর্ডে আবেদন পড়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৬১১টি, রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ২২ হাজার ২২৮, যশোর বোর্ডে ৯১ হাজার ৫৯, চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০১, বরিশাল বোর্ডে ৬১ হাজার ৮৬, সিলেট বোর্ডে ৬০ হাজার ৯৭৪, দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ১১ হাজার ২৬০ ও ময়মনসিংহ বোর্ডে ৮৭ হাজার ১৫৭টি এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৯টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫১ হাজার ২১৪টি আবেদন জমা পড়েছে।
বেশি সতর্কতা ও কঠোরতা
শিক্ষা বোর্ডগুলো পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো, মূল্যায়নে শৃঙ্খলা এবং পরীক্ষকদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এবার পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্কতা ও কঠোরতার ওপর জোর দিয়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীরা মনে করছে, তাদের প্রত্যাশার তুলনায় কম নম্বর এসেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল ফলের বিষয়গুলোতে কম নম্বর পাওয়ার পর পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
যেমন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে মোট আবেদন পড়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি। এর মধ্যে ইংরেজিতে আবেদন পড়েছে ৪৬ হাজারের বেশি এবং গণিতে ৩৪ হাজার। একই চিত্র দেখা গেছে অন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোয়ও। তবে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন বেড়েছে বলেই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের নিশ্চয়তা নেই।
রেকর্ড আবেদনের নেপথ্য কারণ
পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের এই রেকর্ড শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে উদ্বেগের কারণ। তবে উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতির প্রতি আস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্ত নম্বরকে চূড়ান্ত না ধরে পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহছানুক কবির বলেন, উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য অধিকার। উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো চলতি বছর পাবলিক পরীক্ষার আইন পরিবর্তন করা। এ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া, অল্প নম্বরের জন্য ফেল করা বা গ্রেড পরিবর্তন না হওয়া এবং মূল্যায়নপদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে আবেদন বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগে পুনর্নিরীক্ষণে কোনো প্রশ্নের নম্বর যোগ না হওয়া, নম্বর গণনায় ভুল হওয়া কিংবা কোনো উত্তর মূল্যায়নের বাইরে থেকে যাওয়ার বিষয়টি দেখা হতো। এবার সেখানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবার একজন শিক্ষার্থীর পুরো উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়ন হবে।
জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকতারুজ্জামান বলেন, এবার প্রচলিত পুনর্নিরীক্ষণের প্রথা থেকে বের হয়ে নতুন পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়নই আবেদন বাড়ার মূল কারণ। আশা করি দ্রুত সময়ের এসব উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করে ফলাফল প্রকাশ করা হবে।




