অর্থসংকটে ঝুলে আছে ৭০ হাজার শিক্ষকের অবসর সুবিধা

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের বিএম কলেজের শিক্ষক লুৎফর রহমান চাকরিতে থাকা অবস্থাতেই মারা যান। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তার স্ত্রী এলিজা খাতুন স্বামীর অবসর সুবিধার টাকার জন্য আবেদন করেন। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা পাননি তিনি। ঢাকায় অবসর সুবিধা বোর্ডে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত এই নারী বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ।
রাজধানীর ইস্কাটনের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডে সম্প্রতি লুৎফর রহমানের পাওনার খোঁজ নিতে এসেছিলেন কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সালাম। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে চারবার ঢাকায় এলাম। কিন্তু লুৎফর রহমানের অবসর সুবিধার টাকা পাওয়ার কোনো আশা পেলাম না। কবে টাকা মিলবে, সেটিও জানাতে পারেননি কর্মকর্তারা।’
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার আইনগঞ্জ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন ওসমান গণি। অবসরে যাওয়ার পর ২০২৩ সালের জুনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডে টাকার জন্য আবেদন করেন। সম্প্রতি তিনি পাওনার ক্ষুদ্র একটি অংশ হাতে পেয়েছেন; কল্যাণ সুবিধার ৪ শতাংশ ও অবসর সুবিধার ৬ শতাংশ। এখন অপেক্ষায় আছেন বাকি টাকার। শুধু এই দুজন নন, অবসর-কল্যাণের টাকা না পেয়ে অভাব-অনটনে দিন পার করছেন সারা দেশের বহু শিক্ষক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষকের পাওনা টাকা ঝুলে আছে। এসব আবেদন মেটাতে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা লাগবে। ফান্ডে প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায় কাউকে পুরো সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না।
বোর্ডের সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর কোনো শিক্ষক-কর্মচারী অবসরের পূর্ণ টাকা পাননি। চাকরিজীবনের শেষে এসে এই টাকার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে বোর্ডকে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হলেও এখনও তা পাওয়া যায়নি। ফলে এই টাকার সুবিধাও পাচ্ছেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা।
চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত অবসরে যাওয়া ৪৩ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে তাদের নিজেদের জমানো টাকা (৬ শতাংশ) ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ পুরো টাকা পাননি।
কল্যাণ ট্রাস্টেও ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন। তাদের পাওনা পরিশোধ করতে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি লাগবে। ২০২৩ সালের মে থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অবসরে যাওয়া ৫২ হাজার ১০০ জনকে শুধু তাদের জমানো ৪ শতাংশ টাকা দেওয়া হয়েছে।
ট্রাস্টের সচিব অধ্যক্ষ মো. ইউসুফ আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ফান্ডে অর্থসংকটের কারণে ২০২৩ সালের মে মাসের পর থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধার পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। শুধু তাদের নিজেদের জমানো ৪ শতাংশ টাকা দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই বোর্ডের বৈঠক করে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার (৬ ও ৪ শতাংশ) টাকা দেওয়ার অনুষ্ঠান হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সারা দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ শিক্ষককে এই সুবিধার টাকা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে থাকতে অবসরের টাকা পেতে শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। কোনো ভোগান্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীর যন্ত্রণা ছাড়াই যথাসময়ে অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শিক্ষকদের প্রাপ্য টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যাংক-বীমাসহ প্রতিটি খাত থেকে লুটপাট করেছিল। সেই লুটপাট থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্বার্থে গঠিত দুটি তহবিলও রেহাই পায়নি। জাল ইনডেক্স তৈরি, লুটপাটের সুযোগ তৈরির জন্য কল্যাণ তহবিলের টাকা দুর্বল ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে তহবিল দুটিকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ড—এই দুই তহবিলে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতি মাসে টাকা জমা দেন। সরকারও প্রতিটি হিসাবের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে টাকা দেয়। দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার সময় এই টাকা তাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই টাকা তুলতেই এখন নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে বারবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।

