logo
Advertisement

ওজন-ত্বকের এই পরিবর্তনগুলো হতে পারে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ার ইঙ্গিত

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ওজন-ত্বকের এই পরিবর্তনগুলো হতে পারে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ার ইঙ্গিত
শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি ঠিকমতো সাড়া না দিলে তৈরি হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। ছবি : সংগৃহীত

রক্তে শর্করা স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ইনসুলিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হরমোন শরীরের কোষকে রক্তের গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে। কিন্তু শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি ঠিকমতো সাড়া না দিলে তৈরি হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। দীর্ঘদিন এই সমস্যা চলতে থাকলে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

Advertisement

ভালো খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বা ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা উন্নত করা সম্ভব। কিন্তু সেই পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা কি শরীরের কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায়?

সাম্প্রতিক একটি স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে ত্বক ও ওজনের কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে। তবে শুধু এসব পরিবর্তন দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায় না।

ইনসুলিন সেনসিটিভিটি আসলে কী?

সহজভাবে বললে, ইনসুলিন হলো এমন একটি হরমোন, যা রক্তে থাকা গ্লুকোজকে শরীরের কোষে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি ভালোভাবে সাড়া দিলে রক্তের গ্লুকোজ ব্যবহার করা সহজ হয়।

কিন্তু ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে কোষগুলো ইনসুলিনের সংকেতে আগের মতো সাড়া দেয় না। তখন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অগ্ন্যাশয়কে বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। শুরুতে শরীর এই বাড়তি ইনসুলিন দিয়ে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারে বলে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।

সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রক্তে শর্করা বাড়তে পারে এবং প্রিডায়াবেটিস বা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের দিকে যেতে পারে।

ঘাড়ের কালচে ছোপ হালকা হতে পারে

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে ত্বকের একটি বিশেষ পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। ঘাড়, বগল বা কুঁচকির মতো জায়গায় ত্বক কালচে, মোটা ও মখমলের মতো হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থাকে অ্যাক্যানথোসিস নিগ্রিক্যানস বলা হয়।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের অবস্থা উন্নত হলে এই কালচে ছোপ ধীরে ধীরে হালকা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এটিকে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হওয়ার সম্ভাব্য একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ত্বকের রং পরিবর্তনের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু কালচে ছোপ কমে গেলেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

ত্বকের তৈলাক্তভাব ও ব্রণ কমতে পারে

ইনসুলিন ও শরীরের বিপাকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে তৈলাক্ত ত্বক ও ব্রণের মতো সমস্যাও দেখা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হলে কারও কারও ক্ষেত্রে এসব ত্বকের সমস্যা কমতে পারে। তবে ব্রণ কমার সঙ্গে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি সরাসরি উন্নত হয়েছে, এমনটা বলা যায় না। বয়স, ত্বকের যত্ন, হরমোন, খাবারসহ আরও অনেক কারণেও ব্রণ কমতে পারে।

তাই ত্বকের পরিবর্তনকে শুধু একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত।

কোমর ও পেটের মেদ কমতে পারে

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে পেট ও কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমার সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত ওজন ও বিশেষ করে পেটের মেদ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়াতেও পারে।

স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চার ফলে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হলে কোমরের মাপ কমতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ওজনের চেয়ে কোমরের মাপের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে কয়েক দিন বা এক সপ্তাহে সামান্য ওজন কমলেই ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বেড়েছে, এমনটা বলা যাবে না। পরিবর্তনটি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শরীরের ওজন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে

ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত করার ক্ষেত্রে ওজন নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ওজন কমানোর মাধ্যমে অনেকের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডও পেশির ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে সাহায্য করে।

তবে এখানে দ্রুত ওজন কমানো লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু ওজন কমছে বলেই যে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হয়েছে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।


খাওয়ার পর অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ক্ষুধার প্রবণতা কমতে পারে

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের খাওয়ার পর ক্লান্তি, বারবার ক্ষুধা লাগা বা ওজন কমাতে সমস্যা হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে দেখা যায় না এবং এগুলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের নির্দিষ্ট প্রমাণও নয়।

জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার পর যদি খাওয়ার পর আগের তুলনায় বেশি স্বস্তি লাগে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং দিনের শক্তি বা কর্মক্ষমতা ভালো হয়, সেটি সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতির ইঙ্গিত হতে পারে। তবে এই পরিবর্তন দিয়েও ইনসুলিন সেনসিটিভিটি নিশ্চিত করা যায় না।

শুধু ত্বক ও ওজন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়

মনে রাখবেন, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। একজন মানুষের ত্বক ভালো দেখাতে পারে, ওজনও কমতে পারে, কিন্তু তার রক্তে শর্করা বা অন্যান্য বিপাকীয় সূচকে সমস্যা থাকতে পারে। আবার উল্টোভাবে, ত্বকে ব্রণ বা ওজন বেশি থাকলেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স রয়েছে, এমনটাও বলা যায় না।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্যেও বলা হয়েছে, শুধু ত্বক বা ওজনের পরিবর্তন দেখে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রয়োজন হলে রক্তে গ্লুকোজ, এইচবিএ১সি এবং অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি মূল্যায়ন করা হয়।


ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে কী করা যায়?

জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে-

  • নিয়মিত শরীরচর্চা করা
  • অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো
  • শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া
  • অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমানো
  • পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস করা
  • দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে নিয়মিত নড়াচড়া করা

নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড পেশিকে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিনের প্রতি পেশির সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।

কখন পরীক্ষা করানো দরকার?

যাদের ওজন বেশি, পেটে অতিরিক্ত মেদ রয়েছে, পরিবারে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে, শারীরিক পরিশ্রম কম অথবা আগে থেকেই রক্তে শর্করা বাড়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ঘাড় বা বগলে কালচে ও মোটা ত্বকের পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অতিরিক্ত ক্ষুধা, ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা কিংবা রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করা, এইচবিএ১সি এবং অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন। শুধু শরীরের বাইরের পরিবর্তন দেখে নিজের রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়।

ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত হচ্ছে কি না, তা সব সময় শরীরের আয়নায় দেখা যায় না। ঘাড়ের কালচে ছোপ হালকা হওয়া, কোমরের মাপ কমা বা ত্বকের কিছু সমস্যা কমে যাওয়া ভালো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। কিন্তু এগুলো কোনো নিশ্চিত পরীক্ষা নয়।

সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের বিপাকীয় স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

সূত্র: এই সময় অনলাইন, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক