শিশুদের নিয়মিত হার্ট চেকআপ কেন জরুরি

শিশুদের স্বাভাবিক চলাফেরায় অনেক সময় তাদের সুস্থতা বোঝা যায় না। খেলাধুলা, দৌঁড়ানো বা খাওয়াদাওয়া দেখে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের হৃদযন্ত্রও যে সুস্থ আছে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ শিশুদের কিছু হৃদরোগ জন্মগতভাবে থাকতে পারে, আবার কিছু সমস্যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পায়।
অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই শিশুর হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হার্ট চেকআপ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিত কার্ডিয়াক ফলোআপ খুবই জরুরি।
শিশুদের হার্ট চেকআপ কী?
শিশুদের হার্ট চেকআপ হলো এমন কিছু শারীরিক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এর মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের গঠন, স্পন্দন, রক্তপ্রবাহ ও কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
চিকিৎসক প্রথমে স্টেথোস্কোপ দিয়ে শিশুর হৃদস্পন্দন শোনেন এবং রক্তচাপ পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষা করানো হতে পারে। এসব পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো হৃদযন্ত্রের কোনো সমস্যা থাকলে তা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
শিশুদের নিয়মিত হার্ট চেকআপ কেন জরুরি?
শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মতো হৃদযন্ত্রেরও বৃদ্ধি ঘটে। কোনো সমস্যা থাকলে তা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, শারীরিক সক্ষমতা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু হৃদরোগের লক্ষণ শুরুতে স্পষ্ট হয় না। অভিভাবকেরা অনেক সময় সমস্যাটি বুঝতে পারেন না। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কার্ডিয়াক ফলোআপে এসব সমস্যা শনাক্ত করা যায়।
বিশেষ করে যেসব শিশুর জন্মগত হৃদরোগ, হৃদযন্ত্রের ভালভের সমস্যা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা হৃদযন্ত্রের পেশির সমস্যা আছে, তাদের নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা জরুরি। এছাড়া হৃদরোগের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের পরও ফলোআপ দরকার। কারণ শিশুর বয়স ও শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।
শিশুদের হৃদরোগের যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত না
শিশুরা বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের শারীরিক সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না। তাই অভিভাবকদের কিছু লক্ষণের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। যেমন-
খেলাধুলার সময় শ্বাসকষ্ট: সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শ্বাসকষ্ট হওয়া।
ঠোঁট বা আঙুল নীলচে হয়ে যাওয়া: ঠোঁট, জিহ্বা বা আঙুলের ডগায় নীলচে ভাব দেখা দিলে অনেক সময় এটি রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: কোনো কারণ ছাড়াই সব সময় ক্লান্ত থাকা বা অল্প কাজেই শক্তি হারিয়ে ফেলা।
বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি: বিশেষ করে দৌঁড়ানো বা খেলাধুলার সময় বুকে ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করা।
মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: শারীরিক পরিশ্রমের সময় মাথা ঘোরা বা হঠাৎ জ্ঞান হারানোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন: বিশ্রামের সময়ও হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হওয়া।
ওজন না বাড়া বা বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া: বয়স অনুযায়ী শিশুর ওজন ও উচ্চতা না বাড়লে বা শারীরিক বিকাশে ধীরগতি দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে।
তবে, এসব লক্ষণ থাকলেই যে শিশুর হৃদরোগ আছে, তা কিন্তু না। অন্য কারণেও এসব সমস্যা হতে পারে। তবে লক্ষণগুলো বারবার দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কোন শিশুদের কার্ডিওলজিস্ট দেখানো প্রয়োজন?
সব শিশুর জন্য নিয়মিত হার্ট পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন-
• শিশুর জন্মগত হৃদরোগ থাকলে।
• খেলাধুলার সময় বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার সমস্যা হলে।
• কোনো কারণ ছাড়াই অজ্ঞান হয়ে গেলে।
• চিকিৎসকের পরীক্ষায় হৃদযন্ত্রে অস্বাভাবিক শব্দ বা অন্য সমস্যা ধরা পড়লে।
• পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকে আকস্মিক মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে।
• আগে হৃদযন্ত্রের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে।
বিশেষ করে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ফলো-আপ করা প্রয়োজন। এতে চিকিৎসার অগ্রগতি এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
শিশুদের হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে কী করবেন?
শিশুর হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
• প্রতিদিনের খাবারে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, ডিম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন।
• অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমান।
• বয়স অনুযায়ী প্রতিদিন খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহ দিন।
• শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
• শিশুকে ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করুন এবং ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখুন।
• শিশুর ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধির দিকে নজর রাখুন।
• নিয়মিত শিশুস্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, খেলাধুলার সক্ষমতা এবং অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণের দিকে অভিভাবকদের নজর রাখা জরুরি। তবে অকারণে শিশুর বারবার ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রাম করানোর দরকার নেই। শিশুর বয়স, উপসর্গ, পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
তথ্যসূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসে ‘কেন শিশুদের নিয়মিত কার্ডিয়াক চেক-আপ বা ফলো-আপ অত্যন্ত জরুরি?’ এবং Dr. Madhavan Heart Centre- এ ‘When and Why Should Your Child Get a Heart Check-Up?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম শুচি।
