ফুসফুসের ক্যানসার, যে ৭ ভুল ধারণা আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে

ফুসফুসের ক্যানসার বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী ক্যানসার হলেও এ রোগ নিয়ে নানা ভুল ধারণা এখনো প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, ধূমপান না করলে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি নেই বা কাশি না থাকলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণও নেই। আবার কেউ বিশ্বাস করেন, একবার এ রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসায় তেমন কোনো লাভ হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভুল ধারণা মানুষকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তাই ফুসফুসের ক্যানসার সম্পর্কে প্রচলিত মিথ ভেঙে সঠিক তথ্য জানা নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
চলুন ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে ৭টি প্রচলিত ভুল ধারণা জেনে নিই।
ভুল ধারণা ১: ফুসফুসের ক্যানসারের পরীক্ষা সবার জন্য প্রয়োজন
এটি ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুসের ক্যানসারের স্ক্রিনিং সবার জন্য নয়। এটি মূলত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সুপারিশ করা হয়। সাধারণত ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সী, দীর্ঘদিন ধূমপান করেছেন বা সম্প্রতি ধূমপান ছেড়েছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বছরে একবার লো-ডোজ সিটি স্ক্যান করা হতে পারে।
ভুল ধারণা ২: লক্ষণ দেখা দিলেই শুধু পরীক্ষা করাতে হবে
অনেকেই মনে করেন, কাশি, বুকে ব্যথা বা রক্তসহ কাশি না হলে পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই।
কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুসের ক্যানসারের শুরুর পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। যখন উপসর্গ দেখা দেয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে রোগটি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাই যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।
ভুল ধারণা ৩: ফুসফুসের ক্যানসার মানেই মৃত্যুদণ্ড
এটি একটি পুরোনো ধারণা।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক রোগী সফলভাবে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রোপচারই যথেষ্ট হতে পারে। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপিও দেওয়া হয়।
ভুল ধারণা ৪: বুকের এক্স-রেই করালেই ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ে
অনেকে মনে করেন, সাধারণ বুকের এক্স-রেই করলেই প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট টিউমার অনেক সময় এক্স-রেতে ধরা পড়ে না। এ কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য লো-ডোজ সিটি স্ক্যানকে বেশি কার্যকর স্ক্রিনিং পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভুল ধারণা ৫: শুধু ধূমপায়ীদেরই ফুসফুসের ক্যানসার হয়
ধূমপান সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হলেও শুধু ধূমপায়ীরাই এই রোগে আক্রান্ত হন, এমন নয়।
যারা কখনো ধূমপান করেননি, তারাও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন। পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ, অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ, রেডন গ্যাস এবং কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ভুল ধারণা ৬: স্ক্রিনিং করলে ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়
স্ক্রিনিংয়ের কাজ রোগ প্রতিরোধ করা নয়, বরং রোগটি শুরুতেই শনাক্ত করা।
প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসা সহজ হয় এবং রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। তবে ঝুঁকি কমাতে ধূমপান ত্যাগ, তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ভুল ধারণা ৭: ধূমপান ছেড়ে দিলে আর কোনো ঝুঁকি থাকে না
ধূমপান ছেড়ে দেওয়া অবশ্যই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এতে সময়ের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
তবে যারা দীর্ঘদিন ধূমপান করেছেন, তাদের ঝুঁকি সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে নেমে আসে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে স্ক্রিনিং চালিয়ে যাওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনোটি কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- দীর্ঘদিনের কাশি
- কাশির ধরনে হঠাৎ পরিবর্তন
- রক্তসহ কাশি
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- কণ্ঠস্বর বসে যাওয়া
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- দীর্ঘদিনের ক্লান্তি
এসব উপসর্গ সব সময় ক্যানসারের কারণে হয় না, তবে অবহেলা করা উচিত নয়।
ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা অনেক সময় রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় দেরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গুজব বা ভুল তথ্যের বদলে চিকিৎসকদের পরামর্শ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভরসা করা জরুরি। বিশেষ করে যাদের ধূমপানের ইতিহাস রয়েছে বা অন্য কোনো কারণে ঝুঁকি বেশি, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজন হলে স্ক্রিনিং করা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
.png)

