logo
Advertisement

হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাচ্ছে, কিডনির এই লক্ষণগুলো খেয়াল করুন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাচ্ছে, কিডনির এই লক্ষণগুলো খেয়াল করুন
কিডনির কার্যকারিতায় সমস্যা হলে শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ছবি : সংগৃহীত

কখনো হঠাৎ মাথা ঘুরছে, দুর্বল লাগছে, চোখের সামনে ঝাপসা দেখছেন। রক্তচাপ মাপার পর দেখা গেল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কম। একবার এমন হলে হয়তো খুব একটা চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু বারবার রক্তচাপ কমে গেলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার।

Advertisement

নিম্ন রক্তচাপের পেছনে পানিশূন্যতা, কিছু ওষুধ, গর্ভাবস্থা, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, রক্তদক্ষরণসহ নানা কারণ থাকতে পারে। তাই কম রক্তচাপ দেখলেই কিডনির সমস্যা হয়েছে এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে কিডনি শরীরের তরল, লবণ ও খনিজের ভারসাম্য এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে কিডনির কার্যকারিতায় সমস্যা হলে শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের শুরুর দিকে অনেকের কোনো লক্ষণই থাকে না। সমস্যা বাড়ার পর শরীরে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাই কিছু লক্ষণ নিয়মিত দেখা দিলে অবহেলা না করে পরীক্ষা করানো ভালো।

কিডনি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

কিডনির প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেওয়া। এর পাশাপাশি শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য, কিছু খনিজের মাত্রা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও কিডনির ভূমিকা রয়েছে।

কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে অতিরিক্ত তরল ও বর্জ্য জমতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে। কিন্তু এই পরিবর্তন অনেক সময় ধীরে ধীরে হয়। এ কারণেই কিডনি রোগকে অনেক ক্ষেত্রে নীরব সমস্যা বলা হয়।

বারবার কম রক্তচাপ কি কিডনি রোগের লক্ষণ?

এখানে একটু সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নিম্ন রক্তচাপ নিজে থেকে কিডনি রোগের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। সাধারণত কিডনি রোগের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক বেশি পরিচিত। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীর থেকে অতিরিক্ত লবণ ও পানি বের করে দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। আবার দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপও কিডনির রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে বারবার কম রক্তচাপের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা বা কিছু ওষুধের প্রভাবের মতো সাধারণ কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু রক্তচাপ কম হওয়ার ভিত্তিতে কিডনি রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তবে এর সঙ্গে অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন

কিডনির সমস্যা বোঝার ক্ষেত্রে প্রস্রাবের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত হতে পারে। আগের তুলনায় বেশি বা কম প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়া, কিডনি সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

প্রস্রাব অতিরিক্ত ফেনাযুক্ত বা বুদবুদযুক্ত দেখালেও বিষয়টি খেয়াল করা উচিত। প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন বের হলে এমন হতে পারে। তবে একবার ফেনা দেখা গেলেই কিডনি রোগ হয়েছে এমন নয়। বারবার এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলেও অবহেলা করা উচিত নয়। এর পেছনে কিডনি ছাড়াও মূত্রনালির বিভিন্ন সমস্যা থাকতে পারে। তাই কারণ জানতে পরীক্ষা প্রয়োজন।

পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া

কিডনি অতিরিক্ত পানি ও লবণ ঠিকমতো বের করতে না পারলে শরীরে তরল জমতে পারে। এর ফলে পা, গোড়ালি, হাত বা কখনো চোখের চারপাশে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে সকালে চোখের চারপাশ ফুলে থাকা বা দিনের শেষে পা ও গোড়ালি বেশি ফুলে গেলে বিষয়টি নজরে রাখা ভালো। তবে শরীরে পানি জমার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই এই লক্ষণ দেখেও নিজে থেকে কিডনি রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

সব সময় ক্লান্ত লাগা

কাজ করার পর ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি সব সময় দুর্বল, অবসন্ন বা শক্তিহীন লাগে, তাহলে কারণ খুঁজে দেখা দরকার।

কিডনি রোগ বাড়লে শরীরে বর্জ্য জমা হওয়া এবং অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তনের কারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গ খুবই সাধারণ এবং রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপসহ অনেক কারণেই হতে পারে।

ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব

কিডনি রোগ অনেকটা এগিয়ে গেলে ক্ষুধা কমে যেতে পারে। খাবারে অনীহা, বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে। কারণ কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ জমতে শুরু করতে পারে।

তবে শুধু বমি বমি ভাব বা ক্ষুধা কমে যাওয়াকে কিডনি রোগের লক্ষণ ভাবার কারণ নেই। পাকস্থলীর সমস্যা, সংক্রমণ বা অন্যান্য অসুস্থতার কারণেও এমন হতে পারে।

ত্বক শুষ্ক ও চুলকানি

কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে কিছু বর্জ্য পদার্থ জমে যেতে পারে। এর সঙ্গে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত চুলকানির সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে শুষ্ক ত্বক বা চুলকানি খুব সাধারণ সমস্যা। আবহাওয়া, অ্যালার্জি, ত্বকের রোগ বা অন্য অনেক কারণেও এটি হতে পারে। তাই অন্য লক্ষণগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।

পেশিতে টান ও খিঁচুনি

কিডনি শরীরের বিভিন্ন খনিজ ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে এই ভারসাম্যে সমস্যা হতে পারে। ফলে পেশিতে টান বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।

তবে শরীরে পানি কমে যাওয়া, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা অন্যান্য কারণেও পেশিতে খিঁচুনি হতে পারে। তাই এটিকেও এককভাবে কিডনি রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

শ্বাসকষ্টও হতে পারে

কিডনি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমতে পারে। কখনো সেই তরল ফুসফুসের আশপাশে বা ফুসফুসে জমে শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে।

শ্বাসকষ্টের অনেক গুরুতর কারণ থাকতে পারে। তাই হঠাৎ বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে এটিকে শুধু কিডনির সমস্যা ভেবে বসে থাকা ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

কেন পরীক্ষা করা জরুরি?

কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শুরুতে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। ফলে শুধু শরীরের উপসর্গ দেখে কিডনির অবস্থা বোঝা কঠিন। রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়।

রক্ত পরীক্ষায় সাধারণত ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা এবং তা থেকে কিডনির ছাঁকনির ক্ষমতা বা ইজিএফআর হিসাব করা হয়। প্রস্রাব পরীক্ষায় অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের উপস্থিতি দেখা যায়। এই দুটি পরীক্ষাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ।

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?

ডায়াবেটিস, দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, পারিবারিকভাবে কিডনি রোগের ইতিহাস বা দীর্ঘদিন কিছু কিডনি-ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাস থাকলে কিডনি পরীক্ষা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো। বয়স বাড়ার সঙ্গেও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।


কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

রক্তচাপ বারবার কমে গেলে এবং এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এর পাশাপাশি প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাবের পরিমাণে বড় পরিবর্তন, বারবার ফেনাযুক্ত প্রস্রাব, পা বা চোখের চারপাশে ফোলা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব, তীব্র চুলকানি বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিলে কিডনির পরীক্ষা করানো প্রয়োজন হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এসব লক্ষণ থাকলেই কিডনি রোগ হয়েছে এমন নয়। কিন্তু শরীর বারবার একই সংকেত দিলে সেটিকে উপেক্ষা না করে কারণ খুঁজে বের করা দরকার। কারণ কিডনি রোগ যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, এর অগ্রগতি ধীর করার সুযোগও তত বেশি থাকে।

সূত্র: নিউজ ১৮