logo

সমস্যা ত্বকের, নাকি আসলে লিভারের?

সমস্যা ত্বকের, নাকি আসলে লিভারের?

বিখ্যাত উক্তি রয়েছে—হোয়াট ইজ লাইফ, ডিপেন্ডস অন দ্য লিভার। জীবন যখন যেমনই থাকুক, রক্ত পরীক্ষায় এসজিপিটি বা বিলিরুবিনের মাত্রা যখন বর্ডার পেরিয়ে যায়, তার আগে কিন্তু লিভারের অবস্থা বোঝার ফুরসত আমাদের হয়না। তাহলে উপায়? বিশেষজ্ঞদের কথা, ত্বকের দিকে ঠিকঠাক নজর রাখলেও লিভারের ভালো-মন্দ ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। 

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক রোগী চুলকানি, অস্বাভাবিক দাগ বা ত্বকের রং পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়ে আসেন। পরে দেখা যায়, সমস্যার মূল কারণ লিভারের ভেতরে লুকিয়ে আছে।

ভারতের আরটেমিস হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শিফা যাদব বলেন, শরীরের ভেতরে যা ঘটে তার অনেকটাই ত্বকে প্রকাশ পায়। তাই, হঠাৎ বা দীর্ঘদিন ধরে অজানা কারণে ত্বকের পরিবর্তন হলে লিভারের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

একই মত দিয়েছেন নারায়ণ হাসপাতালের লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় গোজা এবং অমরিতা হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সচিন গুপ্ত।

চিকিৎসকদের মতে, ত্বকে নিচের পাঁচটি লক্ষণ লিভারের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া

এটি জন্ডিস নামে পরিচিত। লিভার সঠিকভাবে কাজ না করলে বিলিরুবিন নামের একটি উপাদান রক্তে জমে যায়। ফলে ত্বক ও চোখে হলুদ আভা দেখা দেয়।

সব সময় গাঢ় হলুদ না-ও হতে পারে। অনেক সময় প্রাকৃতিক আলোতে হালকা হলুদ আভা প্রথমে চোখে পড়ে। এমন পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি।

কোনো ফুসকুড়ি ছাড়াই স্থায়ী চুলকানি

অনেক রোগী বলেন, ত্বকের নিচে যেন কিছু হেঁটে বেড়াচ্ছে এমন অনুভূতি হয়। অ্যান্টিহিস্টামিন বা ময়েশ্চারাইজারেও কাজ হয় না।

লিভারের সমস্যায় পিত্ত লবণ ত্বকের নিচে জমে গেলে এমন চুলকানি হতে পারে। বিশেষ করে রাতে চুলকানি বাড়ে এবং ঘুমের সমস্যা তৈরি করে।

মুখ বা বুকে মাকড়সার মতো লাল রক্তনালি

এগুলোকে স্পাইডার অ্যাঞ্জিওমা বলা হয়। ছোট লাল রক্তনালি ছড়িয়ে মাকড়সার মতো দেখায়। ঘাড়, গাল বা বুকের ওপরের অংশে বেশি দেখা যায়।

একটি বা দুটি দাগ সাধারণত চিন্তার কারণ নয়। তবে একাধিক নতুন দাগ হলে লিভারের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

ত্বকের ভাঁজে অস্বাভাবিক কালচে দাগ

ঘাড়, বগল বা কুঁচকির অংশে হঠাৎ কালচে রং দেখা দিলে অনেকেই ঘর্ষণ বা রোদকে দায়ী করেন। কিন্তু দ্রুত বাড়তে থাকলে বা সাধারণ ক্রিমে না কমলে তা বিপাকজনিত বা লিভার সংশ্লিষ্ট সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যায় শরীরের হরমোন ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে, যা ত্বকের রঙে প্রভাব ফেলে।

সহজে আঘাতের দাগ পড়া বা রক্তপাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়া

লিভার রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করে। লিভার দুর্বল হলে ছোট আঘাতেও বড় নীলচে দাগ পড়তে পারে বা ক্ষত থেকে দীর্ঘ সময় রক্তপাত হতে পারে।

অনেক সময় কোনো আঘাত ছাড়াই ত্বকে বেগুনি দাগ দেখা যায়। চিকিৎসকদের কাছে এটি রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

সব লক্ষণ মানেই গুরুতর রোগ নয়

চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলেন, এই লক্ষণগুলো সব সময় গুরুতর লিভার রোগের প্রমাণ নয়। রোদে পোড়া, শুষ্ক ত্বক বা অ্যালার্জির কারণেও এমন হতে পারে।

তবে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণ রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন করলে অনেক ক্ষেত্রে শুরুতেই সমস্যা ধরা পড়ে।

লিভার সুস্থ রাখতে করণীয়

-সুষম ও কম চর্বিযুক্ত খাবার

-নিয়মিত ব্যায়াম

-অতিরিক্ত তেল, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া

-অ্যালকোহল পরিহার

-ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভার ও হেপাটাইটিসের হার বাড়ছে। তাই ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে হালকাভাবে না নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

লিভার প্রতিদিন শরীরের শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। যখন এটি ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, অনেক সময় ত্বকই প্রথম সংকেত দেয়। অজানা চুলকানি, হালকা হলুদ আভা, অস্বাভাবিক দাগ বা সহজে আঘাতের চিহ্ন পড়া কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়।

সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন লিভারের জটিলতা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ত্বককে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে নয়, শরীরের ভেতরের অবস্থার প্রতিফলন হিসেবেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।