বাড়িতে রক্তচাপ মাপার সেরা সময় কোনটি?

আজকাল ঘরে ঘরেই উচ্চ রক্তচাপের রোগী দেখা যায়। নিজের ও পরিবারের মানুষদের রক্তচাপ নজরে রাখতে অনেকেই এখন ঘরে প্রেশার মাপার ডিজিটাল মেশিন বা বিপি মনিটর ব্যবহার করেন। কিন্তু রক্তচাপ মাপার সঠিক সময় না জানার কারণে প্রায়সময়ই সঠিক ফলাফল জানা যায় না।
রক্তচাপ মাপারও একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। ভুল সময়ে প্রেশার মাপলে ভুল রিডিং আসতে পারে। এটি অযথাই আপনার মনে দুশ্চিন্তা তৈরি করতে পারে। তাই প্রেশার মাপার সঠিক সময় ও নিয়মগুলো জেনে রাখা খুবই জরুরি।
ঘরে প্রেশার মাপা কেন জরুরি?
অনেকেই ডাক্তারের কাছে গেলে হাইপার হয়ে যান। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হোয়াইট-কোট হাইপারটেনশন’ বলা হয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে দিনের একেক সময় রক্তচাপের মাত্রা একেক রকম থাকে। তাই ঘরেই যদি নিয়মিত রক্তচাপ মাপা যায়, তাহলে এক্সারসাইজ, ওষুধ বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনে শরীর কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, তার সঠিক ধারণা পাওয়া যায়।
উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক, এর কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা কিডনি ড্যামেজের মতো বড় বিপদ ঘটার আগে এটি কোনো পূর্বসংকেত দেয় না। তাই ঘরে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার অভ্যাস থাকা উচিত। এতে আপনি সবসময়ই আপনার রক্তচাপ পর্যবেক্ষণে রাখতে পারবেন। এটি আপনাকে বড় কোনো বিপদ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
রক্তচাপ মাপার সেরা সময় কোনটি?
আমাদের রক্তচাপ সারাদিন এক রকম থাকে না। দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম হতে পারে। সারাদিনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ, খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুম- এই সবকিছুর ওপর ভিত্তি করে কমবেশি হতে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, বাড়িতে রক্তচাপ মেপে সঠিক ফলাফল পেতে দিনে দুইবার রক্তচাপ মাপা সবচেয়ে ভালো। চলুন সময় দুটি জেনে নিই-

সকালে: আপনি যদি ঘুম থেকে ওঠার ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে রক্তচাপ মেপে নিতে পারেন, সেটি সবচেয়ে ভালো হবে। তবে খেয়াল রাখবেন, বিছানা থেকে উঠেই সঙ্গে সঙ্গে মাপা যাবে না। শরীরকে একটু স্বাভাবিক হতে সময় দিতে হবে।
অর্থাৎ সকালের নাস্তা করার আগে, চা বা কফি খাওয়ার আগে এবং কোনো ধরনের ব্যায়াম বা সকালের ওষুধ খাওয়ার আগেই রক্তচাপ মেপে নিতে হবে। কারণ খাবার বা ক্যাফেইন আমাদের রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
সন্ধ্যায়: দ্বিতীয়বার রক্তচাপ মাপতে পারেন সন্ধ্যার দিকে অথবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে। সারাদিনের ধকলের পর রাতের খাবার খাওয়ার আগে কিংবা ঘুমানোর আগে যখন আপনি সম্পূর্ণ শান্ত ও রিল্যাক্সড অবস্থায় থাকেন, তখন প্রেশার মাপলে সঠিক মান জানা যায়।
বাড়িতে নিয়মিত একই সময়ে প্রেশার মাপার অভ্যাস করুন। এতে আপনার শরীরে কোনো পরিবর্তন হলে তা খুব সহজেই ধরা পড়বে।
প্রেশার মাপার সময় কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন?
অনেক সময় সামান্য কিছু ভুলের কারণে রক্তচাপের মান অনেক কমবেশি হতে পারে। তাই রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়ম মেনে চলা খুব জরুরি। মাপার আগে এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন-
• রক্তচাপ মাপার অন্তত ৩০ মিনিট আগে চা, কফি বা কোনো ধরনের ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকুন। এ ছাড়া ধূমপান করলেও ৩০ মিনিট আগে থেকে তা এড়িয়ে চলুন।

• ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই বা ভারী কোনো কাজ করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেশার মাপবেন না। অন্তত ৩০ মিনিট বিশ্রাম নিন।
• আপনার যদি প্রস্রাবের বেগ থাকে, তবে আগে বাথরুমে সেরে আসুন। প্রস্রাবের চাপ নিয়ে প্রেশার মাপলে রিডিং কিছুটা বেশি আসতে পারে।
• অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মাথা গরম অবস্থায় প্রেশার মাপলে তা সবসময়ই বেশি দেখাবে। তাই আগে মনকে শান্ত ও স্থির করুন।
সঠিক নিয়ম ও বসার ভঙ্গি কেমন হবে?
শুধু সময় মেনে রক্তচাপ মাপলেই হবে না, সঠিক ফলাফল পেতে হলে সঠিক নিয়ম মেনে বসার ভঙ্গি ঠিক রাখাও জরুরি।
তাড়াহুড়ো করে এসে রক্তচাপ মাপবেন না। মেশিন লাগানোর আগে অন্তত ৫ মিনিট কোনো কথা না বলে একদম চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে থাকুন। সোজা হয়ে বসুন। আপনার পিঠ চেয়ারের সঙ্গে ভালোভাবে ঠেকানো থাকবে এবং দুই পা মেঝেতে সমান্তরালভাবে থাকবে। পা ক্রস করে (এক পা অন্য পায়ের উপর তুলে) বসবেন না।
আপনার হাতটি টেবিল বা কোনো কিছুর উপর এমনভাবে রাখুন যেন সেটি আপনার হৃদপিণ্ডের সমান্তরালে থাকে।
বাহুতে কাফ লাগানোর সময় খেয়াল রাখবেন সেটি যেন কাপড়ের ওপর না হয়ে সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে থাকে।
রক্তচাপের নির্ভুল ফলাফল পেতে হলে শুধু একবার মাপাই যথেষ্ট নয়। প্রথমবার মাপার পর ১ থেকে ২ মিনিট বিরতি দিন এবং দ্বিতীয়বার আবার মেপে দুটির গড় বা কাছাকাছি মানটি ধরে রাখুন। সবসময় একই হাতে (ডান বা বাম) প্রেশার মাপার চেষ্টা করুন।
নিয়মিত নিজের রক্তচাপ মেপে একটি চার্ট বা ডায়েরি তৈরি করে রাখুন। এতে আপনার চিকিৎসকের জন্যও রোগ নির্ণয় করা অনেক সহজ হয়ে যায়। আপনার যদি রক্তচাপ ওঠানামা করার সমস্যা থাকে অথবা অতিরিক্ত মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড় করা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি , হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং
