শিশু কী বারবার ক্লান্ত ও অমনোযোগী হয়ে যায়, জানুন কারণ

শিশুকে দেখতে বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে, নিয়মিত খেলাধুলাও করছে। কিন্তু প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না বা খাবার খেতে অনীহা দেখাচ্ছে। অনেক অভিভাবক এসব বিষয়কে সহজ সরল মনে শিশুর স্বভাব বা দুষ্টুমি ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে থাকতে পারে সন্তানের শরীরে আয়রনের ঘাটতি।
শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে আয়রন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন না থাকলে হিমোগ্লোবিন তৈরিতেও সমস্যা হতে পারে। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আয়রনের ঘাটতি বেশি হলে আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বা আয়রন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া পর্যন্ত হতে পারে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুকে বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেও ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব ও খাবার বেছে খাওয়ার মতো আচরণের পেছনে পুষ্টির ঘাটতি থাকতে পারে। তাই শিশুর আচরণে নিয়মিত পরিবর্তন দেখা গেলে শুধু তার স্বভাবকে দায়ী না করে পুষ্টির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়
সাধারণত শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি ধীরে ধীরে তৈরি হয়। শুরুতে লক্ষণগুলো খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। তবে কিছু পরিবর্তনের দিকে অভিভাবকদের নজর রাখা জরুরি।
সব সময় ক্লান্ত থাকা
শিশু পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি ক্লান্ত থাকে, খেলাধুলায় আগ্রহ হারায় কিংবা অল্পতেই হাঁপিয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
তবে ঘুমের অভাব, সংক্রমণ কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণেও শিশু ক্লান্ত থাকতে পারে। তাই সমস্যা নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া
শিশু আগে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারত, কিন্তু এখন সহজেই অন্যদিকে মন চলে যাচ্ছে, নির্দেশনা মনে রাখতে অসুবিধা হচ্ছে কিংবা নতুন কিছু শিখতে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এমন পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে আয়রন গুরুত্বপূর্ণ। এর ঘাটতি শিশুর মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন আয়রনের ঘাটতি থাকলে তা শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
খাবার বেছে খাওয়ার অভ্যাস
অনেক শিশু নির্দিষ্ট কয়েকটি খাবার ছাড়া অন্য কিছু খেতে চায় না। কেউ শাকসবজি এড়িয়ে চলে, কেউ মাছ-মাংস খেতে চায় না, আবার কেউ একই ধরনের খাবার বারবার খেতে পছন্দ করে।
এ ধরনের অভ্যাসের কারণে শিশুর খাবারে আয়রনের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তবে সব বেছে খাওয়া শিশুরই যে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, এমন নয়। শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার নিয়ে অনীহা অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
তাই শিশুর খাবারের তালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রয়েছে কি না, তা খেয়াল করা প্রয়োজন। খাবারের বৈচিত্র্য খুব কম হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
শিশুর ত্বক, ঠোঁট, চোখের পাতার ভেতরের অংশ কিংবা নখের নিচের অংশ আগের তুলনায় ফ্যাকাশে দেখালে সেটি রক্তস্বল্পতার লক্ষণ হতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি থেকে রক্তস্বল্পতা তৈরি হলে শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে যেতে পারে। এর ফলে ত্বক ও মুখের ভেতরের অংশে ফ্যাকাশে ভাব দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু ত্বকের রং দেখে আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করবেন।
খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া
শিশু যদি নিয়মিত খাবার খেতে না চায়, আগের তুলনায় কম খায় কিংবা খাওয়ার সময় বিরক্তি প্রকাশ করে, তাহলে তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আয়রনের ঘাটতি থাকলে কিছু শিশুর ক্ষুধা কমে যেতে পারে। আবার খাবারে অনীহার কারণ হতে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের সমস্যা, অসুস্থতা কিংবা খাবারের প্রতি স্বাভাবিক অনাগ্রহ।
শিশুর ওজন না বাড়া, বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া কিংবা দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শিশুদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি কেন হয়?
শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়া: শিশুর খাদ্যতালিকায় ডাল, মাছ, মাংস, ডিম ও অন্যান্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত না থাকলে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি: শিশুর বেড়ে ওঠার সময় শরীরে আয়রনের চাহিদা বাড়ে। এই চাহিদা পূরণ না হলে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
অপর্যাপ্ত বা একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস: শিশু যদি অল্প কয়েক ধরনের খাবার খায়, তাহলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
আয়রন শোষণে সমস্যা: কিছু পরিপাকতন্ত্রের রোগের কারণে খাবার থেকে আয়রন শোষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ: কিছু ক্ষেত্রে পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ বা অন্য কারণে রক্তের সঙ্গে আয়রন বেরিয়ে যাওয়ায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
শিশুর বয়স, জন্মের সময় ওজন, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থার ওপরও আয়রনের চাহিদা নির্ভর করে। তাই সব শিশুর জন্য একই ধরনের খাদ্যতালিকা বা সাপ্লিমেন্ট উপযুক্ত নয়।
শিশুর আয়রনের ঘাটতি পূরণে কী খাওয়াবেন?
শিশুর প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা প্রয়োজন। আয়রনের ঘাটতি প্রতিরোধে নিচের খাবারগুলো খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
ডাল ও ডালজাতীয় খাবার: মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও মটরশুঁটিতে আয়রন থাকে। শিশুর বয়স অনুযায়ী নরম করে রান্না করে এসব খাবার দেওয়া যেতে পারে।
মাছ ও মাংস: মাছ ও মাংস শিশুর প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সাহায্য করে। বিশেষ করে মাংসে এমন আয়রন থাকে, যা শরীর তুলনামূলক সহজে শোষণ করতে পারে।
ডিম: ডিমে কিছু আয়রনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। শিশুর বয়স ও উপযোগিতা অনুযায়ী সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে ডিম দেওয়া যেতে পারে।
সবুজ শাকসবজি: পালংশাকসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজিতে আয়রন থাকে। পাশাপাশি এগুলোতে অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজও রয়েছে।
ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল: পেয়ারা, কমলা, লেবু ও অন্যান্য ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে এসব ফল রাখা উপকারী।
আয়রনের ঘাটতি প্রতিরোধে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে শিশুর বয়স অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশুকে আয়রন সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার আগে যা জানা প্রয়োজন
শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি সন্দেহ হলে নিজে থেকে আয়রন সিরাপ বা ট্যাবলেট দেওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত আয়রন শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
চিকিৎসক শিশুর লক্ষণ, বয়স, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিতে পারেন। সাধারণত রক্তের হিমোগ্লোবিন, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা সিবিসি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফেরিটিন পরীক্ষার মাধ্যমে আয়রনের ঘাটতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত মাত্রা ও সময় মেনে চলা জরুরি।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
শিশু দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্ত থাকলে, অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে দেখালে, খেলাধুলায় আগ্রহ হারালে, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে অসুবিধা হলে কিংবা ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদ্স্পন্দন, মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ক্লান্তি, অমনোযোগিতা কিংবা খাবারে অনীহা মানেই আয়রনের ঘাটতি নয়। এসব লক্ষণের পেছনে অন্য শারীরিক বা মানসিক কারণও থাকতে পারে। তাই শিশুর আচরণে নিয়মিত পরিবর্তন দেখা দিলে কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াতে ‘Tired, distracted, picky eater? Iron deficiency may be hiding behind a healthy-looking child’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।


