পা ঝিনঝিন থেকে ভুলে যাওয়া, শরীরে যে ভিটামিন কমার ৫ লক্ষণ

সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত লাগা, মাঝে মাঝে হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা কিংবা কোনো কথা মনে করতে একটু সময় লাগা, এসবকে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বিষয় বলেই এড়িয়ে যাই। ব্যস্ত জীবন, কম ঘুম বা মানসিক চাপকে এর কারণ মনে করাও খুব সাধারণ। কিন্তু কখনো কখনো এমন পরিচিত কিছু লক্ষণের পেছনে শরীরে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি থাকতে পারে।
ভিটামিন বি১২ শরীরের লোহিত রক্তকণিকা তৈরি, স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ এবং ডিএনএ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিটামিনের ঘাটতি ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে। ফলে শুরুতে লক্ষণগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না। দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে স্নায়ুর ক্ষতিও হতে পারে।
সাম্প্রতিক এক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদনে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির এমন পাঁচটি তুলনামূলকভাবে অবহেলিত লক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
জিভে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির একটি লক্ষণ দেখা দিতে পারে মুখ ও জিভে। জিভ স্বাভাবিকের তুলনায় মসৃণ, লালচে বা চকচকে হয়ে যেতে পারে। সঙ্গে ব্যথা বা জ্বালাপোড়াও থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের সমস্যাকে গ্লসাইটিস বলা হয়।
কারও কারও ক্ষেত্রে মুখে ঘা বা জিভে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে জিভে অস্বাভাবিক ব্যথা বা জ্বালাপোড়া থাকলে শুধু মুখের সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
তবে জিভে ব্যথা হলেই যে বি১২-এর ঘাটতি হয়েছে, তা নয়। মুখের সংক্রমণ, অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি বা আরও কিছু কারণেও এমন হতে পারে।
হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অসাড় ভাব
হঠাৎ হাত বা পায়ে সুচ ফোটার মতো অনুভূতি হচ্ছে, কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে যাচ্ছে, এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। কিন্তু যদি বারবার হাত-পা ঝিনঝিন করে, অসাড় লাগে বা জ্বালাপোড়া হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
ভিটামিন বি১২ স্নায়ুর সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর ঘাটতি দীর্ঘদিন থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন হাত ও পায়ে ঝিনঝিন, অবশ ভাব, জ্বালাপোড়া কিংবা অনুভূতি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বি১২-এর ঘাটতিতে স্নায়ুর সমস্যা দেখা দেওয়ার জন্য সব সময় রক্তশূন্যতা থাকা জরুরি নয়। অর্থাৎ রক্তের সাধারণ পরীক্ষায় বড় কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা না পড়লেও স্নায়বিক উপসর্গ থাকতে পারে।
কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে? সামান্য কাজ করলেই দুর্বল হয়ে পড়ছেন? এটিও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির একটি লক্ষণ হতে পারে।
ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে মেগালোব্লাস্টিক রক্তশূন্যতা হতে পারে। তখন শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে সমস্যা হয়। এর ফলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু ক্লান্তি দেখেই বি১২-এর ঘাটতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঘুমের সমস্যা, আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, মানসিক চাপসহ নানা কারণেও দীর্ঘদিন ক্লান্তি থাকতে পারে।
মনোযোগ কমে যাওয়া ও স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা
কাজ করতে বসে বারবার মন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে, সহজ কোনো বিষয় মনে করতে সময় লাগছে বা আগের তুলনায় বেশি ভুলে যাচ্ছেন? এসব সমস্যার সঙ্গেও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির সম্পর্ক থাকতে পারে।
বি১২ স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়। ঘাটতি হলে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, চিন্তার গতি ধীর হয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া, বিভ্রান্তি এবং মেজাজের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
অনেকে এসব পরিবর্তনকে বয়স, অতিরিক্ত কাজ বা মানসিক চাপের ফল মনে করেন। কিন্তু এর সঙ্গে যদি হাত-পায়ে ঝিনঝিন, দুর্বলতা বা জিভে ব্যথার মতো অন্যান্য লক্ষণও থাকে, তাহলে বি১২-এর ঘাটতির বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারানো
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করা হলে স্নায়ুতন্ত্রে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। হাঁটার সময় ভারসাম্য রাখতে সমস্যা, বারবার হোঁচট খাওয়া কিংবা পায়ের অবস্থান ঠিকভাবে বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা বিশেষ করে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন বি১২-এর ঘাটতি থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি কখনো কখনো স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। তাই হাত-পায়ের অসাড়তা বা হাঁটার সমস্যাকে শুধু বয়সের কারণে হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কারা বি১২-এর ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি?
ভিটামিন বি১২ মূলত মাছ, মাংস, ডিম ও দুধজাতীয় খাবারে পাওয়া যায়। তাই যারা কোনো ধরনের প্রাণিজ খাবারই খান না, তাদের ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে শুধু খাদ্যাভ্যাসই এর কারণ নয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে খাবার থেকে বি১২ শোষণের ক্ষমতা কমতে পারে। পাকস্থলী বা অন্ত্রের কিছু রোগ, নির্দিষ্ট অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘদিন কিছু ওষুধ ব্যবহারের কারণেও বি১২ শোষণে সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন মেটফরমিন বা পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানোর কিছু ওষুধ ব্যবহার করলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বি১২-এর মাত্রা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তবে কারও ঝুঁকি রয়েছে বলেই নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন বি১২-এর ওষুধ বা ইনজেকশন নেওয়া উচিত নয়।
কীভাবে বুঝবেন সত্যিই বি১২-এর ঘাটতি আছে?
শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা পরীক্ষা করতে পারেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা এবং মিথাইলম্যালোনিক অ্যাসিড বা হোমোসিস্টেইনের মতো পরীক্ষাও করা হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ভিটামিন বি১২-এর স্বাভাবিক মাত্রার সীমা পরীক্ষাগারভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই রিপোর্ট হাতে নিয়ে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
খাবার থেকেই কি বি১২ পাওয়া সম্ভব?
ভিটামিন বি১২-এর ভালো খাদ্য উৎসের মধ্যে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুধজাতীয় খাবার রয়েছে। যারা প্রাণিজ খাবার খান না, তাদের জন্য বি১২ যুক্ত কিছু ফোর্টিফায়েড খাবার বা পরিপূরকের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে কারও শরীরে ইতিমধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়ে গেলে শুধু খাবার বাড়িয়ে দিলেই তা সব সময় ঠিক নাও হতে পারে। শরীর কেন বি১২ শোষণ করতে পারছে না, সেটিও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
একবার হাত-পা ঝিনঝিন করা বা একদিন বেশি ক্লান্ত লাগার কারণে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু সমস্যা যদি বারবার হয় বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে যদি একই সঙ্গে কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়, যেমন-
- দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- হাত-পায়ে ঝিনঝিন বা অসাড়তা
- জিভে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
- স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে পরিবর্তন
- হাঁটার সময় ভারসাম্যের সমস্যা
এসব ক্ষেত্রে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। কারণ বি১২-এর ঘাটতি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি স্থায়ীও হতে পারে।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয় বলে এর লক্ষণগুলো সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। ক্লান্তিকে মনে হতে পারে কাজের চাপের ফল, হাত-পায়ের ঝিনঝিনকে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে, আর ভুলে যাওয়াকে বয়স বা ব্যস্ততার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতে পারে।
কিন্তু এসবের সঙ্গে যদি জিভে ব্যথা, হাত-পায়ে অসাড়তা, হাঁটার সময় ভারসাম্যের সমস্যা বা দীর্ঘদিনের দুর্বলতা যোগ হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং যথাযথ চিকিৎসায় এটি ঠিক করা সম্ভব।
তাই নিজের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন থাকলে অনুমান করে ভিটামিন খাওয়ার বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



