logo

সেলুনে ঘাড় মটকানোর অভ্যাস কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, জানুন সতর্কতার লক্ষণ

সেলুনে ঘাড় মটকানোর অভ্যাস কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, জানুন সতর্কতার লক্ষণ
ছবি: আনন্দবাজার

চুল বা দাড়ি কাটানোর পর ঘাড়ে একটু মালিশ করিয়ে নেওয়া অনেকের কাছেই পরিচিত অভ্যাস। ঘাড় ডানে-বাঁয়ে ঘুরিয়ে মটমট শব্দ বের করার পর অনেকের মনে হয়, যেন ঘাড়ের জড়তা ও ক্লান্তি কিছুটা কমে গেছে। কয়েক মিনিটের এই আরাম তাই সেলুনে যাওয়ার অভিজ্ঞতারই একটি অংশ হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য।

কিন্তু ঘাড়ের এই অংশটি শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। ঘাড়ের মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ ধমনী এবং মেরুদণ্ড ও নানা স্নায়ুর পথ রয়েছে। তাই প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ যদি হঠাৎ জোরে ঘাড় ঘোরান, টান দেন বা মটকানোর চেষ্টা করেন, তাহলে বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ঘাড় মটকালে কীভাবে বিপদ হতে পারে?

ঘাড়ের দুই পাশে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ধমনী রয়েছে, যার মধ্যে মেরুদণ্ডী ধমনীও রয়েছে। ঘাড়ে হঠাৎ জোরালো বা অতিরিক্ত মোচড়ের মতো নড়াচড়ায় খুব বিরল ক্ষেত্রে ধমনীর ভেতরের স্তরে ক্ষত তৈরি হতে পারে। একে সারভাইকাল আর্টারি ডিসেকশন বলা হয়।

এমন ক্ষত হলে ধমনীর দেয়ালের স্তরের মধ্যে রক্ত জমে যেতে পারে এবং রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কের দিকে গিয়ে রক্তনালিতে আটকে গেলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে ইস্কেমিক স্ট্রোক হতে পারে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ঘাড়ে মালিশ বা ঘাড় মটকানোর পর স্ট্রোক হওয়া সাধারণ ঘটনা নয়। এ ধরনের নড়াচড়া ও ধমনী ক্ষতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় কিছু যোগসূত্র পাওয়া গেলেও সরাসরি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও জানিয়েছে, এই সম্পর্কের সঠিক মাত্রা স্পষ্ট নয়।

শুধু ধমনী নয়, ক্ষতি হতে পারে স্নায়ুতেও

ঘাড়ের ভেতর দিয়ে মেরুদণ্ড ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুর পথ রয়েছে। অতিরিক্ত জোরে বা ভুলভাবে ঘাড় নাড়ালে পেশি ও স্নায়ুতে টান লাগতে পারে। ঘাড়ের মেরুদণ্ডের আশপাশের স্নায়ুতে চাপ পড়লে ব্যথা, ঝিনঝিন বা দুর্বলতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

খুব গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে ঘাড়ের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই ঘাড় মটকানোর সময় যত বেশি জোর প্রয়োগ করা হয়, তত বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কী কী লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হবেন?

ঘাড়ে জোরে টান বা মটকানোর পর নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না-

  • হঠাৎ তীব্র বা অস্বাভাবিক ঘাড়ের ব্যথা
  • নতুন করে তীব্র মাথাব্যথা
  • মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো
  • হাঁটতে গিয়ে টলমল করা
  • কথা জড়িয়ে যাওয়া
  • হঠাৎ দৃষ্টিতে সমস্যা হওয়া
  • শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
  • চোখের পাতা ঝুলে পড়া
  • মুখ বা শরীরের এক পাশে অনুভূতি কমে যাওয়া

সারভাইকাল ধমনীতে ক্ষত হলে ঘাড়ের ব্যথা বা মাথাব্যথা প্রথম দিকের লক্ষণ হতে পারে। এরপর মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সমস্যা হলে স্নায়বিক বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মালিশের পর সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা না হলেও কি বিপদ হতে পারে?

সব ক্ষেত্রে সমস্যা সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যাবে, এমন নয়। ধমনীতে ক্ষত তৈরি হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে রক্ত জমাট বাঁধা এবং মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হতে পারে। তাই ঘাড়ে জোরালো নড়াচড়ার পর কয়েক ঘণ্টা বা পরবর্তী সময়ে নতুন ধরনের মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা, মাথা ঘোরা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

সেলুনে ঘাড় মটকানো এড়িয়ে চলবেন কেন?

ঘাড়ের মালিশ আর ঘাড় মটকানো এক বিষয় নয়। হালকা হাতে পেশিতে মালিশ করা এবং জোরে ঘাড় ঘুরিয়ে মটমট শব্দ বের করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষ করে ঘাড়ে দ্রুত, জোরালো বা অতিরিক্ত পরিসরের নড়াচড়া করানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সেলুনে আরাম পাওয়ার জন্য ঘাড় জোরে ঘোরানো বা মটকানোর অভ্যাস না করাই নিরাপদ। ঘাড়ের ব্যথা বা শক্তভাবের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা উপযুক্ত স্বাস্থ্যপেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ঘাড়ে ব্যথা হলে কী করবেন?

ঘাড়ে ব্যথা হলেই ঘাড় মটকানো প্রয়োজন নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্রাম, স্বাভাবিক ও হালকা নড়াচড়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যায়।

ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, অবশভাব কিংবা দুর্বলতার মতো লক্ষণ থাকলে নিজে থেকে ঘাড় মটকানোর বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না

ঘাড়ে মালিশের পর হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাঁটতে সমস্যা হওয়া কিংবা দৃষ্টিতে আকস্মিক পরিবর্তন হলে এটিকে সাধারণ ঘাড়ের ব্যথা মনে করে অপেক্ষা করা উচিত নয়।

এসব স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সেলুনে ঘাড়ে হালকা মালিশ অনেকের কাছে আরামদায়ক হলেও জোরে ঘাড় ঘোরানো বা মটকানোকে নিরাপদ অভ্যাস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঘাড়ের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি, মেরুদণ্ড ও স্নায়ু রয়েছে। খুব বিরল ক্ষেত্রে জোরালো ঘাড়ের নড়াচড়ার সঙ্গে ধমনীতে ক্ষত তৈরি হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যা পরবর্তী সময়ে স্ট্রোকের মতো গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে।

তাই কয়েক মিনিটের আরামের জন্য ঘাড় জোরে মটকানোর অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো। আর এমন কোনো নড়াচড়ার পর অস্বাভাবিক মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা, মাথা ঘোরা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশে দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

সূত্র: আনন্দবাজার