logo

হাম বা মিজেলস: সচেতনতায় কাটবে শঙ্কা

হাম বা মিজেলস: সচেতনতায় কাটবে শঙ্কা

সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম বা মিজেলসের প্রাদুর্ভাব কিছুটা বেড়েছে। এটি শুধু একটি সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ নয়, বরং সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি শিশুর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। হাম নিয়ে অভিভাবকদের মনে থাকা সাধারণ কিছু প্রশ্ন এবং এর সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হলো।

হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী
হামের শুরুটা হয় উচ্চমাত্রার জ্বর দিয়ে। এর সঙ্গে কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং অনবরত নাক দিয়ে পানি পড়তে পারে। জ্বরের প্রায় চার দিনের মাথায় কান বা গলার নিচ থেকে লালচে র‍্যাশ বা দানা বের হতে শুরু করে এবং দ্রুত তা মুখমণ্ডল হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

হাম কতটা ছোঁয়াচে, এর জটিলতা কী
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি মূলত শ্বাসনালির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ভেঙে দেয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কান পাকা, মুখে ঘা এবং এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। শরীরের ভিটামিন ‘এ’ কমে যাওয়ার ফলে চোখের শুষ্কতা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।

জ্বরের সঙ্গে র‍্যাশ মানেই কী হাম
জ্বরের সঙ্গে র‍্যাশ মানেই সবসময় হাম নয়। জার্মান হাম (রুবেলা), ভাইরাল একজ্যান্থেম (ভাইরাসজনিত র‍্যাশ) ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়াতেও এমনটা হতে পারে। তবে উচ্চ জ্বর, চোখ লাল হওয়া এবং গলার নিচ থেকে র‍্যাশ শুরু হওয়া হামের জোরালো লক্ষণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া র‍্যাশ আক্রান্ত প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে আটজনই মূলত হামে আক্রান্ত। বাকি দুজন জার্মান হাম বা রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত।

হাম নিশ্চিতে কী কী পরীক্ষা করা যায়
IgM অ্যান্টিবডি টেস্ট:
এর মাধ্যমে শরীরে সক্রিয় হামের সংক্রমণ আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
আরটি-পিসিআর (RT-PCR): নাক, গলা বা প্রস্রাবের নমুনা থেকে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।

হামের ঝুঁকিতে কারা বেশি

  • মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশু।
  • বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু যারা টিকা নেয়নি।
  • অপুষ্টিতে (বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব) ভোগা শিশুরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
  • গর্ভবতী নারী। 
  • দুর্বল ইমিউনিটির শিশু।
  • ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশু।

 হামে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের করণীয়

  • র‍্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা বা ‘আইসোলেশনে’ রাখুন।
  • পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত তরলপানীয় নিশ্চিত করুন।
  • জ্বর বা র‍্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শিশুকে কখন হাসপাতালে ভর্তি করাবেন
শিশুর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিন—

  • শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
  • বারবার বমি বা মারাত্মক দুর্বলতা।
  • খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া।
  • চোখের মণি ঘোলাটে হওয়া বা দৃষ্টিতে সমস্যা।
  • মুখে গভীর ঘা দেখা দেওয়া।

হামের চিকিৎসা ও ভিটামিন ‘এ’-এর প্রয়োজনীয়তা কী

হামের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। ব্যবস্থাপনা প্রাথমিকভাবে সহায়ক, লক্ষণ উপশম এবং জটিলতা প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হয়। যেমন—
জ্বর হলে প্যারাসিটামল 

চুলকানি থাকলে এন্টিহিস্টামিন 

পরপর দুদিন বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। 

যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল (মোট তিনটি) দিতে হবে। 

চোখে বা কানে সংক্রমণ হলে চোখ, কান ও মুখে এন্টিবায়টিক বা এন্টিফাঙ্গাল ড্রপ/ক্রিম ব্যবহার করতে হয়।

নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মুখে বা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরাপথে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

টিকা নেওয়ার পরও শিশুদের হাম হচ্ছে কেন
বিভিন্ন জায়গায় অনেক শিশু ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা কেউ কেউ একটা নিয়েছে। এর ফলে এসব টিকাবঞ্চিত শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি। আবার অনেক সময় টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও সে পুনরায় হামে আক্রান্ত হতে পারে।

 

যেসব শিশু এখনও হাম টিকা গ্রহণ করেনি বা পূর্ণ ডোজ (দুটি) সম্পন্ন করেনি, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী করণীয় কী হওয়া উচিত

আগামী ৫ এপ্রিল (রোববার) থেকে দেশে বড় পরিসরে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি প্রায় দুই কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও আপনার শিশুকে এই ক্যাম্পেইনে অবশ্যই টিকা দিন।

গর্ভবতী নারী ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরামর্শ

  • কারও জীবনে একবার হাম হয়ে থাকলে তবে সেটি তাকে আজীবন সুরক্ষা দেয়। 
  • গর্ভাবস্থায় হামের টিকা নেওয়া সাধারণত নিষিদ্ধ। কারণ, এটি ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে।
  • প্রাপ্তবয়স্কদের কারও যদি আগে হাম না হয়ে থাকে, টিকা না নিয়ে থাকেন বা টিকাদান সম্পর্কে নিশ্চিত না হন—তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে অন্তত একটি এমএমআর টিকা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার শঙ্কা থাকলে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণের আগে বুস্টার ডোজ বা কমপক্ষে একটি ডোজ এমএমআর টিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

হামের টিকা একটি ‘লাইভ ভ্যাকসিন’, তাই টিকা নেওয়ার আগে নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসককে জানাতে হবে।

হামের টিকা নিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়?
না, হামের টিকা নেওয়ার পর কিছু হালকা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক এবং সাময়িক। যথা—

  • হালকা জ্বর
  • ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা বা লালচে হওয়া
  • হালকা র‍্যাশ (ফুসকুড়ি)
  • সামান্য দুর্বলতা বা অস্বস্তি।

এগুলো সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই নিজে থেকেই সেরে যায়। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই বিরল। টিকার উপকারিতা এ সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তুলনায় অনেক বেশি।

লেখক: এমডি (পেডিয়াট্রিক্স), ডিসিএইচ (শিশু স্বাস্থ্য); সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।