সময় না থাকলেও কেন পুরুষদের নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেকেই মনে করেন ব্যায়াম করার মতো সময় তাদের নেই। অফিসের কাজ, পরিবার, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন দায়িত্বের ভিড়ে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া অনেক সময় পিছিয়ে যায়। অনেকেই হয়তো ভাবেন, সময় একটু ফাঁকা হলে তখন থেকে ব্যায়াম শুরু করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই সময় আর সহজে আসে না।
আসলে নিয়মিত ব্যায়াম করা শুধু শরীর ঠিক রাখার জন্য নয়, সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অল্প সময়ের শারীরিক কার্যক্রমও শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই দিনে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করা সম্ভব না হলেও, সামান্য সময় নিয়মিত শরীরচর্চা করলে তাতেও উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ব্যায়াম হৃদযন্ত্র ভালো রাখা থেকে শুরু করে মানসিক চাপ কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ঘুমের মান উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। নিচে নিয়মিত ব্যায়ামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা তুলে ধরা হলো।
নিয়মিত ব্যায়ামের উপকারিতা
নিয়মিত শরীরচর্চা মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর নানা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কমানো, উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো, রক্তনালি সুস্থ রাখা, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, বয়স বাড়ার সঙ্গে হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করা, কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো, হাড় মজবুত রাখা, শারীরিক সক্ষমতা ভালো রাখা এবং দীর্ঘায়ু হওয়া।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
ব্যায়াম শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। শারীরিক কার্যক্রমের সময় শরীর ক্যালরি ব্যবহার করে। কাজ যত বেশি সক্রিয় হবে, তত বেশি ক্যালরি খরচ হবে।
নিয়মিত জিমে যাওয়া ভালো অভ্যাস হলেও সেটি সম্ভব না হলেও সমস্যা নেই। দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই কিছু শারীরিক কার্যক্রম যোগ করা যায়। যেমন লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, হাঁটা বাড়ানো বা ঘরের কাজ নিজে করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিততা।
বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সহায়ক
নিয়মিত ব্যায়াম হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তনালির বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এটি শরীরে ভালো কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং ক্ষতিকর চর্বি কমাতে সহায়তা করে।
এ ছাড়া ব্যায়াম আরও যেসব সমস্যার ঝুঁকি কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে-
- স্ট্রোক
- মেটাবলিক সিনড্রোম
- টাইপ-২ ডায়াবেটিস
- বিষণ্নতা ও উদ্বেগ
- কিছু ক্যানসার
- আর্থ্রাইটিস
- বয়সজনিত কিছু ঝুঁকি
এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করতেও সাহায্য করে এবং সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।
মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়
ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাঁটা, দৌড়ানো বা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম করলে শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয় যা মনকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।
ফলে নিয়মিত ব্যায়াম করলে মানুষ নিজেকে বেশি স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসী অনুভব করতে পারেন।
শরীরে শক্তি বাড়ায়
দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় মানুষ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পেশি শক্তিশালী হয় এবং সহনশক্তি বাড়ে।
এ ছাড়া ব্যায়াম শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ বাড়ায় এবং হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উন্নত করে। ফলে দৈনন্দিন কাজ করার জন্য শরীরে বেশি শক্তি পাওয়া যায়।
ভালো ঘুমে সহায়তা করে
অনেকেই ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। নিয়মিত ব্যায়াম দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে এবং ঘুমের মান উন্নত করে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম করলে শরীর অতিরিক্ত উদ্দীপিত হয়ে যেতে পারে, তাই সে সময় ব্যায়াম না করাই ভালো।
ব্যক্তিগত জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে
শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্রিয় থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরে শক্তি বাড়ায়, ক্লান্তি কমায় এবং সামগ্রিকভাবে সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ব্যায়াম আনন্দদায়কও হতে পারে
ব্যায়াম মানেই কঠিন বা বিরক্তিকর কিছু নয়। অনেকেই হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নাচের মাধ্যমে শরীরচর্চা করেন।
বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে কোনো শারীরিক কার্যক্রম করলে সেটি আরও আনন্দদায়ক হয়ে উঠতে পারে। এতে সামাজিক যোগাযোগও বাড়ে।
কতটা ব্যায়াম করা উচিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা উচিত। চাইলে ৭৫ মিনিট তুলনামূলক বেশি তীব্র ব্যায়ামও করা যেতে পারে।
মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের মধ্যে রয়েছে
- দ্রুত হাঁটা
- সাইকেল চালানো
- সাঁতার
- ঘরের বা বাগানের কাজ
তীব্র ব্যায়ামের মধ্যে রয়েছে
- দৌড়ানো
- দ্রুত সাঁতার কাটা
- কঠিন শারীরিক কাজ
- অ্যারোবিকস (এক ধরনের নাচ)
এছাড়া সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শরীরের প্রধান পেশিগুলোর জন্য শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা ভালো।
প্রতিদিন অল্প সময়ই যথেষ্ট
ব্যায়ামের জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করতেই হবে এমন নয়। প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট হাঁটাও অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। চাইলে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও যোগ করা যেতে পারে।
প্রথমে এটি কঠিন মনে হলেও প্রতিদিন মাত্র আধা ঘণ্টা সময় বের করা সাধারণত সম্ভব। ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হলে শরীর ও মন দুটোই এর সুফল পেতে শুরু করবে।
জীবনমান উন্নত করে
নিয়মিত ব্যায়াম মানুষের জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি মানসিক চাপ কমায়, ঘুম ভালো করতে সাহায্য করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
দিনে মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যায়ামও শরীরের শক্তি বাড়াতে এবং মন ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ব্যস্ত জীবনে সময়ের অভাব একটি বাস্তবতা হলেও, সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। প্রতিদিন অল্প সময়ের শারীরিক কার্যক্রমও দীর্ঘমেয়াদে বড় উপকার এনে দিতে পারে। তাই সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য আজ থেকেই দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা সময় শরীরচর্চার জন্য বরাদ্দ করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় শুরুটাই সবচেয়ে কঠিন ধাপ। কিন্তু একবার অভ্যাস হয়ে গেলে নিয়মিত ব্যায়াম করা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং এর সুফল ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।