৫ সমস্যা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পান পুরুষরা, বাড়াতে পারে জটিলতা

নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও তাদের শারীরিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে সংকোচবোধ করেন। তারা নানা ধরনের শারীরিক ও যৌনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভোগেন। সামাজিক সংকোচ, লজ্জা বা অন্যের হাসাহাসির ভয়ে অনেকেই এসব সমস্যা পরিবারের সদস্যদের কাছে বলতে চান না। এমনকি জীবনসঙ্গীর কাছেও প্রকাশ করতে চান না।
অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া, পায়ুপথে ফিস্টুলা, পুরুষের স্তন বৃদ্ধি, ইরেক্টাইল ডিসফাংশন ও দ্রুত বীর্যপাতের মতো সমস্যাগুলো নিয়ে অনেক পুরুষ নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। অথচ সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
লজ্জায় চিকিৎসা নিতে দেরি করেন অনেক পুরুষ
পুরুষদের অনেকেই ব্যক্তিগত শারীরিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। বিশেষ করে যৌনস্বাস্থ্য ও প্রজননতন্ত্রের সমস্যা হলে সেই সংকোচ আরও বেড়ে যায়। যে সমস্যাগুলো সঠিক সময়ের চিকিৎসায় হয়তো সেরে যেত, সেগুলোই পরবর্তীতে জটিল আকার ধারণ করে।
অণ্ডকোষের যেসব সমস্যা অবহেলা করা উচিত না
পুরুষদের প্রজননতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অণ্ডকোষ। বিভিন্ন কারণে এই অঙ্গে ফোলাভাব, ব্যথা বা অন্য ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইউরোলজিস্টদের মতে, অণ্ডকোষের কয়েকটি পরিচিত সমস্যা হলো-
হাইড্রোসিল: অণ্ডকোষের চারপাশে তরল জমে ফুলে যাওয়াকে হাইড্রোসিল বলে। আঘাত বা প্রদাহের কারণে এটি হতে পারে। এক পাশে বা দুই পাশেই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হার্নিয়া: পেটের ভেতরের কোনো অংশ দুর্বল জায়গা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে হার্নিয়া হয়। এর ফলে তলপেটে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে, যা অণ্ডকোষের দিকেও নেমে আসতে পারে।
টেস্টিকুলার টরশন: অণ্ডকোষের সঙ্গে যুক্ত শুক্রনালি পেঁচিয়ে গেলে এই সমস্যা হয়। এতে অণ্ডকোষে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
ভেরিকোসিল: অণ্ডকোষের আশপাশের শিরা ফুলে গেলে তাকে ভেরিকোসিল বলে। কখনো এটি কৃমির মতো দেখাতে পারে।
টেস্টিকুলার সিস্ট: অণ্ডকোষের আশপাশে তরলপূর্ণ থলির মতো অংশ তৈরি হলে তাকে সিস্ট বলা হয়।
অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া, ব্যথা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। অণ্ডকোষে কোনো গাঁট বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলেও পরীক্ষা করানো উচিত।
পুরুষের স্তন বৃদ্ধি বা গাইনোকোমেশিয়া
পুরুষের স্তনের টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়াকে গাইনোকোমেশিয়া বলা হয়। হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে সাধারণত এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বয়ঃসন্ধিকালে অনেক ছেলের একপাশে বা দুই পাশের বুকে স্তনের মতো ফোলাভাব তৈরি হতে পারে। সাধারণত এতে ব্যথা থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে এটি কমে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
এই সমস্যায় আক্রান্ত অনেক পুরুষই সংকোচের কারণে খালি গায়ে থাকতে চান না। অন্যের হাসাহাসি বা ঠাট্টার আশঙ্কায় স্বাভাবিক জীবনযাপনেও অস্বস্তি বোধ করেন তারা।
এন্ডোক্রাইনোলজিস্টদের মতে, গাইনোকোমেশিয়ার ক্ষেত্রে বয়স, সমস্যার স্থায়িত্ব ও কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন পরীক্ষা, ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের পরামর্শও দেওয়া হতে পারে।
ইরেক্টাইল ডিসফাংশন ও দ্রুত বীর্যপাত
পুরুষদের যৌনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার মধ্যে ইরেক্টাইল ডিসফাংশন অন্যতম। যৌনমিলনের সময় পুরুষাঙ্গ যথেষ্ট শক্ত অবস্থা ধরে রাখতে না পারাকে ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বলা হয়।
অন্যদিকে, যৌনমিলন শুরু হওয়ার পর প্রত্যাশার তুলনায় খুব দ্রুত বীর্যপাত হওয়াকে প্রিম্যাচিওর ইজাকুলেশন বা দ্রুত বীর্যপাত বলা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে অনেক পুরুষই সাময়িকভাবে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। ক্লান্তি, মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণে সাময়িক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে নিয়মিত এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন-
- উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল
- যৌনাঙ্গের রক্তনালিতে সমস্যা
- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- শারীরিক ও মানসিক চাপ
সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিলে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
কেন পুরুষেরা এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পান?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের শৈশব থেকেই অনেক সময় তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে তাদের দুর্বলতা কখনো প্রকাশ করা উচিত না। পুরুষ মানেই শক্তিশালী আর যৌন সক্ষমতাই পুরুষত্বের পরিচয়, এমন সামাজিক ধারণা অনেকের মধ্যেই কাজ করে।
ফলে যৌনস্বাস্থ্য বা প্রজননতন্ত্রের কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা সেটিকে নিজের পুরুষত্বের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
অনেকে ভয় পান, সমস্যার কথা জানালে পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা জীবনসঙ্গী তাদের নিয়ে হাসাহাসি করবেন। কেউ কেউ আবার অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছেও যেতে চান না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। শারীরিক সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। এর সঙ্গে ব্যক্তির শক্তি, ব্যক্তিত্ব বা পুরুষত্বের কোনো সম্পর্ক নেই।
পুরুষদের এসব সমস্যা সমাধানে সঙ্গীর ভূমিকা
পুরুষদের শারীরিক ও যৌনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা সমাধানে জীবনসঙ্গী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। অনেক সময় কাছের মানুষই প্রথম শারীরিক পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেন।
এ ক্ষেত্রে সঙ্গীর সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। সমস্যাটি নিয়ে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করা উচিত। বিদ্রূপ, দোষারোপ বা অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে পুরুষদেরও নিজের শারীরিক সমস্যা গোপন না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক সমস্যারই জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
কোন সমস্যায় কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
পুরুষদের এসব শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য রোগের ধরন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ইউরোলজিস্ট: অণ্ডকোষের বিভিন্ন সমস্যা, ইরেক্টাইল ডিসফাংশন ও দ্রুত বীর্যপাতের চিকিৎসায়।
সার্জন: হার্নিয়া ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় এমন কিছু অণ্ডকোষের সমস্যায়।
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট: গাইনোকোমেশিয়া ও হরমোনজনিত সমস্যায়।
কোলোরেক্টাল সার্জন: পায়ুপথের ফিস্টুলার চিকিৎসায়।
আমাদের দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতেও এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ আছে।
শারীরিক বা যৌনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা কোনো লজ্জার বিষয় না। বরং সমস্যা গোপন করে চিকিৎসা নিতে দেরি করলেই ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিজের সুস্থতার কথা বিবেচনা করে সংকোচ কাটিয়ে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

