বয়স বাড়লে শুধু ওজন নয়, কোমরের মাপও যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ওজন নিয়ে অনেকেরই দুশ্চিন্তা বাড়ে। ওজন একটু বেশি দেখালেই অনেকে মনে করেন, যত দ্রুত সম্ভব তা কমাতে হবে। আবার কেউ কেউ শুধু ওজনের ওপর নজর রেখে শরীর কতটা সুস্থ, তা বোঝার চেষ্টা করেন।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ওজন আর কোমরের মাপকে একইভাবে দেখা ঠিক নয়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে শুধু বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই দিয়ে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিচার করলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে। বরং শরীরের কোথায় চর্বি জমছে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে কতটা চর্বি রয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ বিষয় উঠে এসেছে। বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে বিএমআই বেশি থাকা সবসময় বেশি মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। অন্যদিকে কোমরের মাপ বেশি হওয়া, অর্থাৎ পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকা, মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
কী নিয়ে গবেষণা হয়েছে?
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ৬,৯০৫ জন মানুষের ১৪ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের বিএমআই, কোমরের মাপ এবং মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখা হয়েছে। বয়স, ধূমপান, আয়, শিক্ষা ও অন্যান্য কিছু বিষয়ও হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছিল।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Journal of the American Geriatrics Society-তে। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল, বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে শুধু বিএমআই নয়, বিএমআইয়ের সঙ্গে কোমরের মাপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যায় কি না, তা বোঝা।
বেশি বিএমআই থাকলেই কি ঝুঁকি বেশি?
এখানেই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল।
স্বাভাবিক ওজনের মানুষের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকি কম ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির স্থূলতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা গেছে। পুরুষদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির স্থূলতার ক্ষেত্রে প্রায় ৫১ শতাংশ কম দেখা গেছে।
নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে এই ফল দেখে এমনটা ভাবার কারণ নেই যে বেশি ওজন বা স্থূলতা বয়স্ক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর। গবেষণাটি মূলত একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে। অতিরিক্ত ওজন মৃত্যুঝুঁকি কমানোর কারণ, এমন প্রমাণ এই গবেষণা দেয়নি।
বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে বিএমআইয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক জটিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশি কমে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এবং অসুস্থতার কারণে ওজন কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো বিএমআইয়ের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাহলে কোমরের মাপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিএমআই মূলত উচ্চতার তুলনায় শরীরের ওজন কত, তা হিসাব করে। কিন্তু শরীরে চর্বি কোথায় জমেছে, তা বিএমআই বলে না।
একজন মানুষের বিএমআই স্বাভাবিক হলেও তাঁর পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকতে পারে। আবার একই বিএমআইয়ের দুই ব্যক্তির শরীরে চর্বির পরিমাণ ও বণ্টন একেবারেই আলাদা হতে পারে।
কোমরের মাপ কিছুটা হলেও পেটের চারপাশের চর্বি বা কেন্দ্রীয় স্থূলতার ধারণা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিএমআই বিবেচনায় নেওয়ার পরও বেশি কোমরের মাপ বয়স্ক পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা গেছে।
অর্থাৎ শুধু ওজন কত, তা জানলেই শরীরের চর্বি সম্পর্কিত পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
স্বাভাবিক ওজন হলেও পেটের মেদ থাকলে?
এটি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি।
যাঁদের বিএমআই স্বাভাবিক কিন্তু কোমরের মাপ বেশি, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একইভাবে যাঁরা খুব কম ওজনের, তাঁদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি ছিল।
অর্থাৎ বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে শুধু ওজন কমানোই সব সময় লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। খুব কম ওজনও সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে কেউ বাইরে থেকে খুব রোগা দেখালেও তাঁর পেশি কমে গিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আবার ওজন খুব বেশি না হলেও পেটের চারপাশে চর্বি জমতে পারে।
তাই শরীরের ওজনের পাশাপাশি কোমরের মাপ, পেশির শক্তি, দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
BMI আসলে কী?
বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই হলো উচ্চতার তুলনায় শরীরের ওজনের একটি হিসাব। সাধারণভাবে একজন মানুষের ওজনকে তাঁর উচ্চতার বর্গ দিয়ে ভাগ করে বিএমআই বের করা হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ১৮ দশমিক ৫-এর নিচে বিএমআইকে কম ওজন, ১৮ দশমিক ৫ থেকে ২৪ দশমিক ৯ পর্যন্ত স্বাভাবিক ওজন, ২৫ থেকে ২৯ দশমিক ৯ পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন এবং ৩০ বা তার বেশি স্থূলতা হিসেবে ধরা হয়।
তবে এই শ্রেণিবিন্যাস সবার ক্ষেত্রে একইভাবে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বোঝায় না। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে বিএমআইয়ের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
কারণ বিএমআই পেশি, হাড়, চর্বি এবং শরীরের ভেতরে চর্বির অবস্থান আলাদা করে দেখাতে পারে না।
বয়স বাড়লে খুব দ্রুত ওজন কমানো কি ঠিক?
অনেক বয়স্ক মানুষ ওজন বাড়ার ভয় থেকে খাবার কমিয়ে দেন বা দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে হঠাৎ বা অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়া বরং সতর্ক হওয়ার বিষয় হতে পারে।
ক্ষুধা কমে যাওয়া, দাঁতের সমস্যা, গিলতে অসুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, হজমের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে বয়স্ক ব্যক্তির ওজন কমতে পারে।
তাই হঠাৎ ওজন কমে গেলে সেটিকে সব সময় ভালো খবর হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশেষ করে কোনো চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পেটের চর্বি কেন বেশি চিন্তার?
পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি শুধু শরীরের বাহ্যিক গড়নের বিষয় নয়। কেন্দ্রীয় স্থূলতা বিভিন্ন বিপাকীয় ও হৃদ্স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কোমরের মাপ বেশি থাকার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক নিয়ে আগের গবেষণাতেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী মানুষের ওপর করা একটি বড় মেটা-বিশ্লেষণে বেশি কোমরের মাপের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল, এমনকি বিএমআইয়ের শ্রেণি বিবেচনা করার পরও।
এ ছাড়া আরও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে, শরীরে চর্বি কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা শুধু মোট ওজনের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাহলে বয়স্কদের জন্য আদর্শ ওজন কত?
এই গবেষণা থেকে বয়স্ক মানুষের জন্য একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ওজন ঠিক করে দেওয়া যায় না।
বরং গবেষণাটি বলছে, বয়স বাড়লে শুধু বিএমআইয়ের একটি সংখ্যা দেখে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একজন মানুষের ওজনের পাশাপাশি কোমরের মাপ, শারীরিক সক্ষমতা, পেশির শক্তি, খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য রোগের বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার।
কেউ অতিরিক্ত ওজনের হলেও যদি সক্রিয় থাকেন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সূচক ভালো থাকে, তাঁর ক্ষেত্রে শুধু ওজন কমানোর ওপর জোর দেওয়া সব সময় সঠিক নাও হতে পারে।
আবার বিএমআই স্বাভাবিক হলেও কোমরের মাপ বেশি হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
খুব রোগা হওয়াও কি সমস্যা?
গবেষণায় কম ওজনের বয়স্ক ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি হওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
এটি বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বয়স বাড়লে অসুস্থতার সময় শরীরের পেশি ও ওজন দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে খুব কম ওজন কখনো কখনো শরীরের দুর্বলতা বা অপুষ্টির ইঙ্গিত হতে পারে।
তাই বয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ওজন কমানোকে সব সময় স্বাস্থ্যকর লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং স্বাস্থ্যকর ওজনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টি ও পেশির শক্তি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ফিতার মাপ দিয়ে স্বাস্থ্য বিচার নয়
কোমরের মাপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিও স্বাস্থ্য নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
একজন মানুষের উচ্চতা, বয়স, লিঙ্গ, পেশির পরিমাণ, শারীরিক কর্মকাণ্ড, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য রোগের বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।
তাই কোমরের মাপ বেশি হলেই কেউ অসুস্থ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। এটি বরং চিকিৎসকের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করার একটি অতিরিক্ত তথ্য হতে পারে।
কী করবেন বয়স্করা?
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ওজন নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ, সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা বা ব্যায়াম করা এবং পেশির শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও প্রয়োজন।
ওজন বা কোমরের মাপ দ্রুত পরিবর্তিত হলে সেটিও নজরে রাখা উচিত। বিশেষ করে কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ওজন নিয়ে প্রচলিত ধারণা যে সব সময় প্রযোজ্য নয়, নতুন গবেষণাটি সেই বিষয়টি আবার সামনে এনেছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৬,৯০৫ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশি বিএমআই সব সময় বেশি মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অন্যদিকে কোমরের মাপ বেশি থাকা, অর্থাৎ পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকা, স্বাধীনভাবে বেশি মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তবে এর অর্থ বয়স্ক মানুষকে ওজন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া নয়। গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক এবং এর ফল থেকে অতিরিক্ত ওজন মৃত্যুঝুঁকি কমায়, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাস্থ্য বিচার করতে শুধু ওজন বা বিএমআইয়ের একটি সংখ্যা দেখলেই হবে না। শরীরের গঠন, কোমরের মাপ, পেশির শক্তি, শারীরিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য একসঙ্গে বিবেচনা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সিএনএন



