logo

অ্যান্টিবায়োটিক চলার সময় মিষ্টি খাবার কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, যা বলছে নতুন গবেষণা

অ্যান্টিবায়োটিক চলার সময় মিষ্টি খাবার কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, যা বলছে নতুন গবেষণা
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই ওষুধ শুধু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াই কমায় না, অন্ত্রে থাকা কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালে অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য বা গাট মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন আসতে পারে।

এবার নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার সময় বেশি পরিমাণে মিষ্টি বা চিনি-সমৃদ্ধ খাবার খেলে এই পরিবর্তন আরও বাড়তে পারে। গবেষণায় বিশেষ করে দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে এন্টারোকক্কাস (Enterococcus) নামের একটি ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে বেশি বেড়ে উঠতে পারে।

গবেষণাটি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Nature জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের ওপর গবেষণাটি করা হয়েছে হেমাটোপোয়েটিক বা রক্ত তৈরির কোষ প্রতিস্থাপন নেওয়া রোগীদের মধ্যে। তাই সাধারণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল হবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাচ্ছে না।


অ্যান্টিবায়োটিক অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে কেন?

আমাদের অন্ত্রে কোটি কোটি অণুজীব বসবাস করে। এদের মধ্যে অনেক ব্যাকটেরিয়া খাবার হজম, বিপাকক্রিয়া এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজে ভূমিকা রাখে।

অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রমণকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস বা দমন করার পাশাপাশি কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়াকেও কমিয়ে দিতে পারে। ফলে অন্ত্রে আগে থেকে থাকা বিভিন্ন জীবাণুর মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া খাবার ও জায়গার জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। এই প্রতিযোগিতা সম্ভাব্য ক্ষতিকর জীবাণুর অতিরিক্ত বেড়ে ওঠা ঠেকাতেও সাহায্য করে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে উপকারী ব্যাকটেরিয়া কমে গেলে সেই স্বাভাবিক প্রতিরোধ কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

নতুন গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

গবেষকেরা হেমাটোপোয়েটিক কোষ প্রতিস্থাপন নেওয়া ১৭৩ জন রোগীর ৯ হাজার ৪১৯টি হাসপাতালের খাবারের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি ১ হাজারের বেশি মল নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

তাদের লক্ষ্য ছিল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় রোগীরা কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন এবং সেই খাবারের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা দেখা।

গবেষণায় দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় বেশি মিষ্টি ও চিনি-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সময়ে এন্টারোকক্কাস নামের ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।

গবেষণার হিসাবে, অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার পর অতিরিক্ত ১০০ গ্রাম মিষ্টি বা চিনি-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য প্রায় ২৪ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এখানে মনে রাখতে হবে, ১০০ গ্রাম চিনি বা মিষ্টি খেলে সবার অন্ত্রের জীবাণু ঠিক ২৪ শতাংশ কমে যাবে, এমন অর্থ এই ফলাফলের নয়। এটি গবেষণায় পাওয়া একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক।

কোন ব্যাকটেরিয়া বেশি বেড়েছে?

গবেষণায় বিশেষভাবে এন্টারোকক্কাস faecium-এর বৃদ্ধি নজরে এসেছে।

এন্টারোকক্কাস সাধারণত মানুষের অন্ত্রে অল্প পরিমাণে থাকতে পারে। কিন্তু অন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হলে এটি অতিরিক্ত বেড়ে উঠতে পারে। হাসপাতালভিত্তিক গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণ হতে পারে এবং কিছু এন্টারোকক্কাস অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধীও হতে পারে।

গবেষকেরা মনে করছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুগুলো কমে যাওয়ার পর অতিরিক্ত সহজ শর্করা Enterococcus-এর বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চিনি খেলেই এন্টারোকক্কাস সংক্রমণ হবে।

ইঁদুরের ওপর পরীক্ষাতেও একই ইঙ্গিত

মানুষের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি গবেষকেরা ইঁদুরের ওপরও পরীক্ষা করেছেন।

অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর ইঁদুরের অন্ত্রে এন্টারোকক্কাসের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছিল। এরপর তাদের খাবারে সুক্রোজ বা সাধারণ চিনি যোগ করা হলে ব্যাকটেরিয়াটির বৃদ্ধি আরও বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গবেষণায় তৃতীয় দিনে অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে সুক্রোজ পাওয়া ইঁদুরে এন্টারোকক্কাসের পরিমাণ শুধু অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া ইঁদুরের তুলনায় প্রায় ১৬ গুণ বেশি ছিল। ষষ্ঠ দিনে এই পার্থক্য প্রায় ৩৩ গুণে পৌঁছায়।

তবে ইঁদুরের গবেষণার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। এটি মানুষের গবেষণায় দেখা সম্পর্কের সম্ভাব্য জৈবিক ব্যাখ্যা বোঝাতে সাহায্য করে।

মিষ্টি খেলেই কি অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতি বাড়বে?

এখানেই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

মানুষের গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীরা সাধারণ সুস্থ মানুষ ছিলেন না। তারা স্টেম-সেল প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাদের অনেকেরই গুরুতর অসুস্থতা ছিল।

গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক ছিল। অর্থাৎ গবেষকেরা রোগীদের খাবার ও অন্ত্রের জীবাণুর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের এলোমেলোভাবে বেশি বা কম চিনি খেতে দেওয়া হয়নি।

তাই চিনি সরাসরি অন্ত্রের ক্ষতি করেছে, এমন নিশ্চিত কারণ-ফল সম্পর্ক এই গবেষণা একাই প্রমাণ করে না। গবেষণার লেখকেরাও মানুষের ওপর আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালে কী খাবেন?

এই গবেষণার অর্থ অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালে একেবারেই চিনি খাওয়া যাবে না, এমন নয়।

তবে অতিরিক্ত মিষ্টি, মিষ্টি পানীয় এবং বেশি চিনি যুক্ত খাবার কমিয়ে রাখা সাধারণভাবেই ভালো খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি বা গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা চললে খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।

মিষ্টির বদলে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে খাওয়া যাবে কি না, সেটি ওষুধের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করবেন না

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক দিক হলো, এর কারণে কেউ যেন চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ না করেন।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় হতে পারে। চিকিৎসক যে মাত্রা ও সময়ের জন্য ওষুধ দিয়েছেন, তা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ থাকলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।


অ্যান্টিবায়োটিকের পরও অন্ত্রের জীবাণু বদলাতে পারে

অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব শুধু ওষুধ খাওয়ার সময়েই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি বড় গবেষণায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন কয়েক বছর পরেও দেখা গেছে।

এ কারণে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ না খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?

নতুন গবেষণার ফল বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ এবং স্টেম-সেল প্রতিস্থাপন নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য ইতিমধ্যেই নানা কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে।

তাই ক্যানসারের চিকিৎসা, স্টেম-সেল প্রতিস্থাপন বা দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো পরিস্থিতিতে খাদ্যতালিকা নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তন না করে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ওষুধ হলেও এটি অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন Nature গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় বেশি চিনি ও মিষ্টি খাওয়া অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য কমে যাওয়া এবং এন্টারোকক্কাসের মতো ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইঁদুরের পরীক্ষাতেও সুক্রোজের কারণে এই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি আরও বেড়েছে।

তবে মানুষের গবেষণাটি একটি নির্দিষ্ট উচ্চঝুঁকির রোগী গোষ্ঠীর ওপর করা এবং এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক। তাই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে চিনি একইভাবে অন্ত্রের ক্ষতি করবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না।

তারপরও অ্যান্টিবায়োটিক চলাকালে অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনি-সমৃদ্ধ খাবার কমিয়ে সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস রাখা যুক্তিসংগত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু বা বন্ধ না করা।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া