logo

বাসি খাবার কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, গরম জিনিস ঠান্ডা করে খেলে কী উপকার আসে

বাসি খাবার কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, গরম জিনিস ঠান্ডা করে খেলে কী উপকার আসে
ছবি: রিডার্স ডাইজেস্ট

রান্না করা খাবার বেঁচে গেলে অনেকেই তা ফ্রিজে রেখে পরদিন গরম করে খান। সাধারণত সময় বাঁচানো বা খাবারের অপচয় কমানোর জন্যই এমনটা করা হয়ে থাকে। তবে কিছু খাবার রান্নার পর ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলে তার শর্করার গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে তৈরি হয় এক ধরনের শর্করা, যার নাম রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাবার হিসেবে কাজ করে।

ভাত, আলু ও পাস্তার মতো শর্করাজাতীয় খাবার ঠান্ডা হলে সাধারণত এই পরিবর্তন দেখা যায়। তাই কিছু ক্ষেত্রে সদ্য রান্না করা খাবারের তুলনায় ঠান্ডা করে রাখা খাবার শরীরের জন্য সামান্য ভিন্ন উপকার দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই না যে ফ্রিজে রাখা সব খাবারই বেশি স্বাস্থ্যকর হয়ে যায়। মূলত খাবারের ধরন, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করে।

রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ কী?

রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ হলো এমন এক ধরনের শর্করা, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে সহজে হজম হয় না। সাধারণ স্টার্চের মতো দ্রুত ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হওয়ার বদলে এটি বৃহদন্ত্রে পৌঁছাতে পারে। সেখানে অন্ত্রের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া এটি ভেঙে তারপর একে ব্যবহার করে।

এ কারণে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চকে খাদ্যআঁশের মতো উপকারী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে বিবেচনা করা হয়। এটি অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করা বৃদ্ধির মাত্রা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর প্রভাব খাবারের ধরন, পরিমাণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

কোন কোন খাবার ঠান্ডা করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে?

ভাত: গরম ভাত রান্নার পর ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলে এর কিছু স্টার্চ রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চে পরিণত হতে পারে। ফলে ভাতের কিছু অংশ হজমে বেশি সময় লাগে এবং রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব কিছুটা কম পরে। তবে চালের ধরন ও রান্নার পদ্ধতি অনুযায়ী এই পরিবর্তনের মাত্রা আলাদা হতে পারে।

আলু: আলুতে থাকা স্টার্চ রান্নার সময় সহজে হজমযোগ্য হয়। কিন্তু রান্নার পর ঠান্ডা করলে এর কিছু অংশের গঠন বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হার্ভার্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, সেদ্ধ রাসেট আলু ঠান্ডা করার পর তাতে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চের পরিমাণ বাড়তে পারে। তাই আলুর সালাদ বা ফ্রিজে রাখা সেদ্ধ আলু এই ধরনের স্টার্চের একটি উৎস হতে পারে।

পাস্তা: রান্না করা পাস্তা ঠান্ডা করে রাখলেও কিছু স্টার্চের গঠন বদলে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ তৈরি হতে পারে। ফলে এটি শরীরে কীভাবে হজম হবে, তাতে কিছুটা পার্থক্য আসতে পারে। তবে পাস্তার সঙ্গে কী ধরনের সস, চিজ বা অন্যান্য উপাদান যোগ করা হচ্ছে, সেটিও খাবারটির সামগ্রিক পুষ্টিগুণে প্রভাব ফেলে।

ডাল ও শিমজাতীয় খাবার: ডাল, মটরশুঁটি ও বিভিন্ন ধরনের শিমে প্রাকৃতিকভাবেই রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ ও খাদ্যআঁশ থাকে। রান্নার পর ঠান্ডা করলে কিছু ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এসব খাবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টি জোগানোর পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় উদ্ভিজ্জ প্রোটিন যোগ করে।

ওটস: ওটস রান্না করে ঠান্ডা করলেও স্টার্চের গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। রাতভর ফ্রিজে রাখা ওটস বা ওভারনাইট ওটস তাই রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ পাওয়ার একটি উপায় হতে পারে। তবে এতে চিনি, সিরাপ বা মিষ্টি উপাদান বেশি যোগ করলে খাবারটির সামগ্রিক স্বাস্থ্যগুণ কমে যেতে পারে।

ঠান্ডা খাবার শরীরের জন্য কীভাবে উপকারী হতে পারে?

রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চের সম্ভাব্য উপকার কয়েকটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।

অন্ত্রের স্বাস্থ্য: বৃহদন্ত্রে পৌঁছে এটি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাবার হিসেবে কাজ করে। এসব ব্যাকটেরিয়া শরীরের জন্য উপকারী কিছু স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করতে পারে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ সাধারণ স্টার্চের তুলনায় কম দ্রুত হজম হয়। তাই কিছু খাবারের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা বৃদ্ধির গতি কম হতে পারে।

খাদ্যআঁশের পরিমাণ বাড়ানো: রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ খাদ্যআঁশের মতো কাজ করে। এটি খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করতে পারে।

তবে শুধু খাবার ঠান্ডা করে খেলেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে বা ওজন কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এই বিষয়ে গবেষণার ফল খাবারের ধরন ও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ।

খাবার ফ্রিজে রাখার সঠিক নিয়ম

খাবার ঠান্ডা করে রাখলে কিছু পুষ্টিগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভুলভাবে সংরক্ষণ করলে খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও জন্মাতে পারে। বিশেষ করে রান্না করা ভাত দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

নিরাপদে খাবার সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি নিয়ম মেনে চলুন।

  • রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি রাখবেন না। পরিবেশের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এক ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখুন।
  • বড় হাঁড়িতে খাবার রেখে না দিয়ে ছোট ও অগভীর পাত্রে ভাগ করে রাখুন। এতে খাবার দ্রুত ঠান্ডা হবে।
  • ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখুন।
  • সাধারণভাবে রান্না করা খাবার ফ্রিজে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলুন। এর বেশি সময় রাখতে হলে উপযুক্তভাবে ফ্রিজারে সংরক্ষণ করুন।
  • খাবার পুনরায় খাওয়ার আগে ভালোভাবে গরম করুন। সম্ভব হলে খাবারের ভেতরের তাপমাত্রা ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।

মনে রাখবেন, খাবার গন্ধে বা দেখতে ভালো লাগলেও তাতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। তাই শুধু গন্ধ শুঁকে খাবার নিরাপদ কি না, তা নির্ধারণ করবেন না।

রান্না করা ভাত, আলু, পাস্তা ও ডাল ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলে কিছু খাবারে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চের পরিমাণ বাড়তে পারে। এই পরিবর্তন অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উপকারের মাত্রা সাধারণত সীমিত এবং খাবারের ধরন ও রান্নার পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

তাই শুধু খাবার ঠান্ডা করে খাওয়ার ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত শাকসবজি ও খাদ্যআঁশ গ্রহণ এবং নিরাপদে খাবার সংরক্ষণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

- Reader's Digest: This Food Is Healthier as a Leftover

- Harvard Health: Resistant starch and its health benefits

- University of Miami Health System: 6 Food Hacks That Work

- USDA: Leftovers and Food Safety