শীতকালে যে ভিটামিনের ঘাটতি দুর্বল করতে পারে হাড়, ভারসাম্য ঠিক রাখতে যা খাবেন

শীতকালে অজান্তেই আমাদের শরীরের ভেতরে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। এসময় দিন ছোট হয়ে যায়, মাঝে মাঝে তো সূর্যের দেখাই পাওয়া যায় না। আর ঠান্ডার কারণে আমরাও বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে কম্বল মুড়ে শুয়ে থাকি। ফলে আমাদের ত্বক সূর্যের আলোর সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ পায় না বললেই চলে। আর এতেই শরীরে হুট করে ভিটামিন ডি এর মাত্রা কমে যায়।
অনেকেই মনে করেন, ভিটামিন ডি কমে যাওয়া মানে হয়তো একটু ক্লান্তি বা ভিটামিনের অভাব। কিন্তু এই একটি ভিটামিনের ঘাটতি আমাদের শরীরের পুরো ক্যালসিয়াম সিস্টেমকে ওলটপালট করে দিতে পারে। খেয়াল করে দেখবেন, শীতে সামান্য আঘাতেই গায়ে ব্যথা লাগে বা জয়েন্টের ব্যথা বেড়ে যায়। আমরা ভাবি হয়তো বেশি শীতের কারণে এমন হয়।
শীতকালে রোদের অভাবে শরীরে ভিটামিন ডি কমে যায়। আর তার মাসুল দিতে হয় হাড়ের ভেতরে থাকা ক্যালসিয়ামকে। শীতকালে ভিটামিন ডি কমে গেলে আমাদের শরীরে, বিশেষ করে হাড়ের ক্যালসিয়ামে কী প্রভাব পড়ে চলুন জেনে নিই-
ভিটামিন ডি কীভাবে ক্যালসিয়াম নিয়ন্ত্রণ করে?
ভিটামিন ডি সাধারণ কোনো ভিটামিন না। এটি আমাদের শরীরে হরমোনের মতো কাজ করে। আমরা যখন সূর্যের আলোর সংস্পর্শে যাই বা কোনো খাবার খাই, তখন আমাদের লিভার ও কিডনি সেই ভিটামিন ডি-কে তার কার্যকরী রূপ ‘ক্যালসিট্রিওল’ এ রূপান্তর করে।

এই সক্রিয় উপাদানটি আমাদের শরীরে মূলত দুটি কাজ করে-
ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে: ভিটামিন ডি খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম শোষণে শরীরকে সহায়তা করে। আমরা সারাদিনে দুধ, দই বা ক্যালসিয়ামযুক্ত অনেক খাবার খাই। সেগুলো ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে টেনে রক্তে পৌঁছানোর মূল দায়িত্ব পালন করে এই ভিটামিন ডি। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে আপনি যতই ক্যালসিয়াম খান না কেন শরীর তা ঠিকমতো গ্রহণই করতে পারবে না।
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে: ভিটামিন ডি প্যারাথাইরয়েড হরমোনের (পিটিএইচ) সঙ্গে মিলে একসঙ্গে কাজ করে। আমাদের গলায় থাকা প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নির্গত হরমোনের সঙ্গে মিলে ভিটামিন ডি রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা একদম ঠিক রাখে।
আপনি যতই ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান না কেন, শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে সেই ক্যালসিয়াম কোনো কাজেই আসবে না।
ভিটামিন ডি কমলে শরীর যেভাবে বিকল্প ক্ষতিকর উপায় বেছে নেয়
মাংসপেশি সচল রাখা, স্নায়ুর বার্তা আদান-প্রদান করা এবং হৃৎপিন্ডের স্পন্দন স্বাভাবিক রাখার জন্য রক্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকা খুবই জরুরি। শীতকালে যখন শরীরে ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রাও কমে আসতে শুরু করে, তখন শরীর নিজের জরুরি কাজগুলোকে সচল রাখতে বিকল্প উপায় বেছে নেয়। সাময়িক কাজগুলো চললেও এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
শরীরের প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি তখন দ্রুত পিটিএইচ হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি বজায় রাখতে শরীর হাড় থেকে ক্যালসিয়াম টেনে নেয় এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার হার কমিয়ে দেয়।
এর ফলে আপনার রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে হয়তো ক্যালসিয়ামের মাত্রা একদম স্বাভাবিক দেখাবে। কিন্তু শরীর রক্তে ক্যালসিয়াম ঠিক রাখতে গিয়ে হাড়কে দিন দিন দুর্বল ও ভঙ্গুর করে ফেলছে।
দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি কী হতে পারে?
শীতকালে ভিটামিন ডি-এর এই সাময়িক ঘাটতি যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতেই থাকে, তবে তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হাড় দুর্বল ও নরম হয়ে যাওয়া: দীর্ঘদিন হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ক্ষয় হতে থাকলে হাড়ের ঘনত্ব বা ডেনসিটি কমে যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড় নরম হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক রোগ ‘অস্টিওম্যালাসিয়া’ হতে পারে।

মাংসপেশির দুর্বলতা: ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে পেশির শক্তি কমে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষেরা এতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে ফেলার ঝুঁকিতে থাকেন।
পেশিতে টান ও খিঁচুনি: যদি ভিটামিন ডি মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং শরীর আর হাড় থেকেও রক্তে ক্যালসিয়াম জোগাতে না পারে, তখন রক্তে ক্যালসিয়াম হুট করে কমে যায়। এটি হাইপোক্যালসেমিয়া নামক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে হাত-পা ঝিনঝিন করা, পেশিতে তীব্র টান ধরা বা খিঁচুনি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
শীতকালে শরীরকে কীভাবে সামলে রাখবেন?
শীতের দিনে এই সংকট থেকে নিজের শরীর ও হাড়কে রক্ষা করতে আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি।
প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় মাত্রা জানুন
ভিটামিন ডি: ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৬০০ আইইউ ভিটামিন ডি-এর প্রয়োজন হয় এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনীয়তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রতিদিন ৮০০ আইইউ-তে।
ক্যালসিয়াম: ক্যালসিয়ামের চাহিদার ক্ষেত্রে, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হয়। তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারী এবং ৭১ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ প্রতিদিন ১,২০০ মিলিগ্রাম হওয়া উচিত।
যে খাবারগুলো বেশি করে খাবেন
ভিটামিন ডি-এর জন্য: চর্বিযুক্ত মাছ (যেমন সামুদ্রিক মাছ, রুই-কাতলার পেটি), ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ দুধ বা ফলের জুস খেতে পারেন। যেহেতু প্রাকৃতিকভাবে খুব কম খাবারেই পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকে, তাই শীতকালে; বিশেষ করে যাদের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাদের জন্য সাপ্লিমেন্ট বা পরিপূরক গ্রহণ করা সহায়ক হতে পারে। তবে সাপ্লিমেন্ট নেয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

ক্যালসিয়ামের জন্য: খাঁটি দুধ, দই, পনির, কাঁটা সহ ছোট মাছ, সয়াবিন এবং সবুজ শাকসবজি খেতে পারেন। সাধারণত খাবারের মাধ্যমেই ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করা সবচেয়ে ভালো। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
শীতের সকালে অন্তত ১৫ বা ২০ মিনিট গায়ে রোদ লাগানোর চেষ্টা করুন। আর যদি আপনার ত্বক বেশি কালচে হয়, হজমে সমস্যা থাকে বা আপনি দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে থাকেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট বা ক্যাপসুল খাওয়া শুরু করতে পারেন।
শীতের আমেজ উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের হাড়ের স্বাস্থ্যের কথাও মাথায় রাখতে হবে। সাধারণ একটু অসচেতনতায় যদি হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ক্ষয় হতে শুরু করে, তবে তা পরবর্তীতে বড় ভোগান্তির কারণ হতে পারে। তাই শীতে শরীরকে পর্যাপ্ত রোদের সংস্পর্শে রাখুন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং নিজের খেয়াল রাখুন।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ভেরি ওয়েল হেলথ ‘What Happens to Your Calcium Levels When Your Vitamin D Drops in Winter?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম।
