লিভারের গুরুতর রোগে মস্তিষ্কে যে সমস্যা হতে পারে
-b6cbc5-720x405.webp)
লিভারের কথা উঠলে সাধারণত হজম, পিত্ত তৈরি বা শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেওয়ার বিষয়গুলোই মনে আসে। কিন্তু লিভারের সঙ্গে মস্তিষ্কেরও যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তা অনেকেরই জানা নেই।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, লিভার ও মস্তিষ্কের মধ্যে রক্তপ্রবাহ, বিপাকক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, হরমোন, স্নায়ু এবং অন্ত্রের জীবাণুর মাধ্যমে একটি জটিল যোগাযোগ রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সম্পর্ককে লিভার-ব্রেন অক্ষ বলা হয়। লিভারে গুরুতর সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে লিভারের গুরুতর রোগে রক্তে অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর পদার্থ জমে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করতে পারে। এতে মনোযোগ কমে যাওয়া, ভুলে যাওয়া, আচরণে পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব এমনকি গুরুতর অবস্থায় অচেতন হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
লিভার ও মস্তিষ্কের মধ্যে কীভাবে যোগাযোগ হয়?
লিভারকে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র বলা যায়। খাবার থেকে শোষিত নানা উপাদান রক্তের মাধ্যমে লিভারে পৌঁছায়। লিভার সেগুলোর অনেকগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে এবং ক্ষতিকর কিছু পদার্থকে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার উপযোগী করে।
অন্যদিকে লিভার থেকে তৈরি বা পরিবর্তিত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান শরীরের অন্য অঙ্গের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মস্তিষ্কও এর বাইরে নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অন্ত্রও। অন্ত্রে থাকা অসংখ্য জীবাণু বিভিন্ন বিপাকীয় উপাদান তৈরি করে। এসব উপাদানের কিছু লিভার প্রক্রিয়াজাত করে। আবার অন্ত্র, লিভার ও মস্তিষ্কের মধ্যে স্নায়বিক ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমেও যোগাযোগ চলে।
অর্থাৎ লিভার, অন্ত্র ও মস্তিষ্ককে একেবারে আলাদা অঙ্গ হিসেবে দেখলেও শরীরের ভেতরে তারা বিভিন্ন উপায়ে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।
লিভার নষ্ট হলে মস্তিষ্কে কী হয়?
লিভারের গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। সুস্থ লিভার শরীরে তৈরি হওয়া অ্যামোনিয়াকে ইউরিয়ায় রূপান্তর করতে সাহায্য করে। পরে ইউরিয়া শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
কিন্তু লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই কাজ ব্যাহত হতে পারে। তখন রক্তে অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। এসব পদার্থ মস্তিষ্কে পৌঁছে মস্তিষ্কের কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
এই অবস্থাকে বলা হয় হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি। এটি সাধারণ ভুলে যাওয়া বা মাঝে মাঝে মাথা ঝিমঝিম করার মতো বিষয় নয়। এটি লিভারের গুরুতর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি চিকিৎসাগত জটিলতা।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
লিভারের সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব পড়লে শুরুতে লক্ষণ খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন-
- কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া
- আগের তুলনায় বেশি ভুলে যাওয়া
- চিন্তা করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে ধীর হয়ে যাওয়া
- আচরণ বা ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসা
- অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া
- সময় বা জায়গা সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া
- কথা জড়িয়ে যাওয়া
- হাত-পায়ে কাঁপুনি বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া
- সজাগ থাকার ক্ষমতা কমে যাওয়া
অবস্থা গুরুতর হলে অচেতন হয়ে যাওয়া এমনকি কোমাও হতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে লিভারের সমস্যা রয়েছে, তা নয়। স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগ কমে যাওয়ার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই নিজে থেকে লিভারের রোগ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
শুধু অ্যামোনিয়াই দায়ী নয়
লিভারের সমস্যা থেকে মস্তিষ্কে প্রভাব পড়ার বিষয়টি শুধু অ্যামোনিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়।
লিভারে দীর্ঘদিন প্রদাহ থাকলে শরীরে বিভিন্ন প্রদাহজনিত রাসায়নিক পদার্থ বেড়ে যেতে পারে। এসব উপাদান রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রভাব ফেলতে পারে এবং মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কোষগুলোকেও সক্রিয় করতে পারে। এতে মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত পরিবর্তন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ ছাড়া লিভারের অসুস্থতার সঙ্গে বিপাকক্রিয়া, ইনসুলিনের কার্যক্রম, রক্তনালির স্বাস্থ্য এবং অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যের পরিবর্তনও যুক্ত হতে পারে।
ফ্যাটি লিভারেও কি মস্তিষ্কের সম্পর্ক রয়েছে?
এখানে গবেষণার একটি নতুন দিক সামনে এসেছে।
মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা ফ্যাটি লিভার সাধারণত অতিরিক্ত ওজন, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রার মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক গবেষণায় ফ্যাটি লিভার এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রমের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। প্রদাহ, ইনসুলিন প্রতিরোধ, রক্তনালির পরিবর্তন, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং অন্ত্র-লিভার-মস্তিষ্কের যোগাযোগের পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই জায়গায় একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। এখনো এমন প্রমাণ নেই যে ফ্যাটি লিভার সরাসরি ডিমেনশিয়া ঘটায়। অনেক গবেষণাই পর্যবেক্ষণভিত্তিক বা প্রাথমিক পর্যায়ের। তাই ফ্যাটি লিভার হলেই ভবিষ্যতে স্মৃতিশক্তি নষ্ট হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
অন্ত্রও এখানে গুরুত্বপূর্ণ
লিভার ও মস্তিষ্কের সম্পর্কের সঙ্গে অন্ত্রেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অন্ত্রে থাকা জীবাণু বিভিন্ন ধরনের বিপাকীয় উপাদান তৈরি করে। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ও বিপাকক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। লিভার এসব উপাদানের অনেকগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে।
আবার অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে ভেগাস নার্ভসহ বিভিন্ন স্নায়বিক পথেও সংকেত আদান-প্রদান হয়। এই পুরো যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষুধা, বিপাক, ঘুম ও শরীরের শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
তাই এখন লিভার, অন্ত্র ও মস্তিষ্ককে নিয়ে একসঙ্গে গবেষণা করা হচ্ছে।
লিভার ভালো রাখলে কি মস্তিষ্কও ভালো থাকবে?
লিভার সুস্থ রাখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে লিভার ভালো রাখলেই ডিমেনশিয়া বা অন্য কোনো মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধ করা যাবে, এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনো নেই।
তবে লিভার ও মস্তিষ্কের পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্যও কিছু সাধারণ অভ্যাস উপকারী।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা ভালো।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম লিভার ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
খাবারে শাকসবজি ও আঁশ রাখুন: শাকসবজি, ফল, ডাল ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখুন: রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের অস্বাভাবিক মাত্রা ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা পরিপূরক খাবেন না: কিছু ওষুধ ও ভেষজ বা খাদ্যপরিপূরক লিভারের ক্ষতি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত কোনো ওষুধ বা পরিপূরক গ্রহণ না করাই ভালো।
হঠাৎ আচরণ বদলে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন
কারও দীর্ঘদিনের লিভারের রোগ থাকলে হঠাৎ আচরণ পরিবর্তন, বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা সচেতনতা কমে যাওয়াকে হালকা করে দেখা উচিত নয়।
বিশেষ করে গুরুতর লিভার রোগের রোগীর ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথির লক্ষণ হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
মস্তিষ্ককে আমরা সাধারণত শরীরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে দেখি। কিন্তু মস্তিষ্ক একা কাজ করে না। লিভার, অন্ত্র, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ও বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ রয়েছে।
লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তে অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর পদার্থ জমে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত করতে পারে। আবার ফ্যাটি লিভারের মতো বিপাকীয় রোগের সঙ্গেও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে ফ্যাটি লিভার মানেই মস্তিষ্কের রোগ হবে, এমন নয়। গবেষণা এখনো চলছে এবং এই সম্পর্কের অনেক কিছুই বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন।
তাই লিভার ভালো রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন, রক্তে শর্করা ও চর্বি নিয়ন্ত্রণ এবং লিভারের কোনো রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া। লিভারের যত্ন শুধু একটি অঙ্গকে সুস্থ রাখার বিষয় নয়, সামগ্রিক শরীরের স্বাস্থ্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনডিটিভি



