লক্ষণ বোঝার আগেই যেভাবে ইউরিক অ্যাসিড শরীরের ক্ষতি করে

মানবদেহে পুরিন নামের একটি উপাদান ভাঙলে যে রাসায়নিক তৈরি হয় তাকে ইউরিক অ্যাসিড বলা হয়। পুরিন সাধারণত কিছু খাবার ও পানীয়তে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় অল্প পরিমাণ ইউরিক অ্যাসিড রক্তে দ্রবীভূত হয়, পরে কিডনির মাধ্যমে ছেঁকে প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
কিন্তু যখন রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হয়ে যায়, যাকে হাইপারইউরিসেমিয়া বলা হয়, তখন নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনেক সময় শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না, কিন্তু শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে ক্ষতি হতে থাকে। নিচে ইউরিক অ্যাসিডের এমন কয়েকটি প্রভাব তুলে ধরা হলো।
হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ক্ষতি
ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হলে রক্তনালিতে প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হতে পারে। এতে ধীরে ধীরে ধমনির ভেতরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রক্তনালি শক্ত হয়ে যায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এমনকি হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কিডনির ক্ষতি
কিডনি রক্ত থেকে ইউরিক অ্যাসিড ছেঁকে বের করে। কিন্তু মাত্রা বেশি হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হয়ে কিডনিতে জমতে পারে। শুরুতে ব্যথা না হলেও ধীরে ধীরে কিডনির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বা কিডনি বিকলের ঝুঁকি বাড়ে।
মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি
মেটাবলিক সিনড্রোম এমন একটি অবস্থা যেখানে একসঙ্গে কয়েকটি সমস্যা দেখা যায়। যেমন পেটের মেদ বেড়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া, ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকা এবং ভালো কোলেস্টেরল কমে যাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরিক অ্যাসিড ইনসুলিন প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যা ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
হাড় ও জয়েন্ট দুর্বল হয়ে পড়া
অনেক সময় গাউট ধরা পড়ার আগেই ইউরিক অ্যাসিড ধীরে ধীরে জয়েন্টে জমতে শুরু করে। এতে কার্টিলেজ ও হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, ফোলা বা বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
কিডনিতে পাথর তৈরি
উচ্চ ইউরিক অ্যাসিডের কারণে অনেকের কিডনিতে পাথর তৈরি হয়। ইউরিক অ্যাসিডের স্ফটিক একত্রিত হয়ে ছোট পাথর তৈরি করতে পারে। শুরুতে এগুলো ছোট থাকলেও পরে বড় হয়ে প্রস্রাবের পথ বন্ধ করে দিতে পারে এবং সংক্রমণ বা কিডনির স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরিক অ্যাসিড বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। কারণ এটি রক্তনালিকে সংকুচিত ও শক্ত করে ফেলতে পারে। প্রথম দিকে কোনো লক্ষণ না থাকলেও ধীরে ধীরে এটি বড় স্বাস্থ্যসমস্যায় পরিণত হতে পারে।
শরীরে নীরব প্রদাহ
ইউরিক অ্যাসিড জমে গেলে শরীরে নিম্নমাত্রার প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। শুরুতে তেমন কোনো ব্যথা না থাকলেও এই প্রদাহ দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কী করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা যায়।
ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়লেও অনেক সময় শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু নীরবে এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সচেতন থাকা, সুষম জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

