কম বয়সীদের মধ্যে বাড়চ্ছে মস্তিষ্কে টিউমার, জানুন কারণ

ক্যানসার বললেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত বয়স্ক মানুষের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। এখন তুলনামূলক কম বয়সী মানুষের মধ্যেও কিছু ধরনের ক্যানসার ধরা পড়ছে। বিশেষ করে ২০, ৩০ বা ৪০-এর কোঠায় থাকা মানুষের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবর আগের চেয়ে বেশি নজরে আসছে।
মস্তিষ্কের টিউমার নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা তরুণ বয়সে মস্তিষ্কের টিউমার শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে জীবনযাপন, পরিবেশ, বায়ুদূষণ, কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং রোগ শনাক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দেরির মতো বিষয় উঠে এসেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। তরুণদের মধ্যে মস্তিষ্কের টিউমার কেন বাড়ছে, এর একটি নির্দিষ্ট কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো চিহ্নিত করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটও বলছে, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের টিউমারের সঠিক কারণ এখনো অজানা।
মস্তিষ্কের টিউমার আসলে কী
মস্তিষ্কের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করলে সেখানে টিউমার তৈরি হতে পারে। সব টিউমার ক্যানসার নয়। কিছু টিউমার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না এবং তুলনামূলক ধীরে বাড়ে। আবার কিছু টিউমার ক্যানসারজাতীয় এবং দ্রুত বাড়তে পারে।
মস্তিষ্কের টিউমারের ধরনও অনেক রকম। টিউমারটি মস্তিষ্কের কোন অংশে তৈরি হয়েছে, কতটা বড় হয়েছে এবং কোন ধরনের কোষ থেকে তৈরি হয়েছে, তার ওপর এর লক্ষণ ও চিকিৎসা নির্ভর করে।
তরুণদের মধ্যেও কি সত্যিই ক্যানসার বাড়ছে?
কিছু ক্ষেত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী তরুণ ও তরুণদের মধ্যে সব ধরনের ক্যানসারের নতুন রোগীর সংখ্যা ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে গড়ে প্রতি বছর প্রায় শূন্য দশমিক তিন শতাংশ করে বেড়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে তরুণদের মধ্যে সব ধরনের ক্যানসার একই হারে বাড়ছে। কোন ক্যানসার কতটা বাড়ছে, তার ধরন আলাদা।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের টিউমারও তরুণদের মধ্যে দেখা যায়। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্যানসার ক্যানসারজনিত মৃত্যুর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি।
তাহলে কম বয়সে মস্তিষ্কের টিউমার হওয়ার কারণ কী?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এর উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রে বয়স, বংশগত কিছু সমস্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত সংস্পর্শ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে পরিচিত ঝুঁকির কারণ খুব বেশি নয় এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই কোনো স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
তাই একজন তরুণের মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়লে শুধু তার জীবনযাপন বা কোনো একটি অভ্যাসকে দায়ী করা ঠিক হবে না।
বায়ুদূষণ কি ভূমিকা রাখছে?
বর্তমানে বায়ুদূষণ ও ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বায়ুদূষণকে ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, বিশেষ করে ফুসফুসের ক্যানসারের ক্ষেত্রে।
মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রেও পরিবেশগত দূষণের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে বায়ুদূষণ সরাসরি তরুণদের মস্তিষ্কের টিউমারের কারণ, এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছানো যায়নি।
অর্থাৎ বায়ুদূষণ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে, কিন্তু মস্তিষ্কের টিউমারের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না।
কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শও কি ঝুঁকি বাড়ায়?
কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিকের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ভিনাইল ক্লোরাইডের মতো কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ নির্দিষ্ট ধরনের মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিদিনের সাধারণ জীবনে কোনো রাসায়নিকের সামান্য সংস্পর্শ হলেই মস্তিষ্কে টিউমার হবে।
ঝুঁকি সাধারণত নির্ভর করে কোন পদার্থ, কত পরিমাণে এবং কত দীর্ঘ সময় ধরে তার সংস্পর্শে আসা হয়েছে, তার ওপর।
বংশগত কারণও থাকতে পারে
কিছু বিরল বংশগত রোগ মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন কিছু নির্দিষ্ট বংশগত রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
তবে এই ধরনের বংশগত সমস্যা খুব সাধারণ নয়। পরিবারের কারও মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে মানেই পরিবারের অন্য সবারও হবে, এমন নয়।
মাথাব্যথাকে কি অবহেলা করা হচ্ছে?
মস্তিষ্কের টিউমার নিয়ে আলোচনায় মাথাব্যথার বিষয়টি প্রায়ই আসে। কিন্তু মাথাব্যথা হলেই মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
মাথাব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, পানিশূন্যতা, চোখের সমস্যা, মাইগ্রেনসহ নানা কারণে মাথাব্যথা হতে পারে।
তবে মাথাব্যথার ধরন যদি হঠাৎ বদলে যায়, ক্রমেই বাড়তে থাকে বা এর সঙ্গে অন্য কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কোন লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন?
মস্তিষ্কের টিউমারের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে একই হয় না। টিউমার মস্তিষ্কের কোথায় তৈরি হয়েছে এবং কতটা বড় হয়েছে, তার ওপর লক্ষণ নির্ভর করতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- বারবার বা ক্রমে বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
- খিঁচুনি
- বারবার বমি বমি ভাব বা বমি
- চোখে দেখতে সমস্যা
- কথা বলতে সমস্যা
- হাঁটা বা শরীরের ভারসাম্য রাখতে সমস্যা
- শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
- আচরণ বা ব্যক্তিত্বে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- মনোযোগ দিতে সমস্যা
- অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব
এসব লক্ষণের কোনোটিই একা মস্তিষ্কের টিউমারের প্রমাণ নয়। কিন্তু নতুন কোনো লক্ষণ বারবার দেখা দিলে বা দ্রুত বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তরুণদের ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়?
তরুণ বয়সে কোনো গুরুতর রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম ধরে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তাই মাথাব্যথা, দুর্বলতা, বমি বা মনোযোগের সমস্যাকে অনেক সময় ঘুমের অভাব, কাজের চাপ বা মানসিক চাপ বলে ধরে নেওয়া হয়।
এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরাও এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
তবে এর মানে এই নয় যে সামান্য মাথাব্যথা হলেই মস্তিষ্কের পরীক্ষা করাতে হবে। বরং কোনো লক্ষণ অস্বাভাবিক, নতুন বা ক্রমে খারাপ হলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সঠিক মূল্যায়ন করানোই গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল ফোন কি মস্তিষ্কের টিউমারের কারণ?
মোবাইল ফোন নিয়ে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মস্তিষ্কের টিউমারের সঙ্গে সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের সরাসরি কারণগত সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাই শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে তরুণদের মধ্যে মস্তিষ্কের টিউমার বাড়ছে, এমন দাবি করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
জীবনযাপনের ভূমিকা কতটা?
ক্যানসারের ক্ষেত্রে জীবনযাপনের কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি অনেক ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ নতুন ক্যানসার রোগী ২০২২ সালে এমন কিছু কারণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেগুলো প্রতিরোধযোগ্য।
তবে এসব ঝুঁকি মস্তিষ্কের সব ধরনের টিউমারের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করে, এমন প্রমাণ নেই।
তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মস্তিষ্কের টিউমার প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে এটিকে দেখা যাবে না।
তাহলে কীভাবে সতর্ক থাকবেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের শরীরের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া।
নতুন কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সেটি কত দিন ধরে আছে, কত ঘন ঘন হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে কি না, তা খেয়াল করুন। একই সমস্যা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
একই সঙ্গে ধূমপান থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার মতো অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এসব পদক্ষেপ সামগ্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ভয় নয়, সচেতনতাই গুরুত্বপূর্ণ
তরুণ বয়সে মস্তিষ্কের টিউমারের খবর শুনে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কারণ মস্তিষ্কের টিউমার তুলনামূলকভাবে বিরল এবং এর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না।
বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি বিষয় মনে রাখা, বয়স কম বলে কোনো অস্বাভাবিক শারীরিক লক্ষণকে সবসময় সাধারণ সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন হলে তা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
তরুণদের মধ্যে কিছু ধরনের ক্যানসারের হার বাড়ছে, এটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে। মস্তিষ্কের টিউমারও তরুণ বয়সে হতে পারে। তবে কেন হচ্ছে, তার একটি নির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।
জীবনযাপন, পরিবেশ, বায়ুদূষণ, কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং বংশগত কারণ নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু কোনো একটি কারণকে তরুণদের মস্তিষ্কের টিউমার বাড়ার জন্য দায়ী করা এখনই সম্ভব নয়।
তাই অকারণে ভয় না পেয়ে শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া, দীর্ঘস্থায়ী বা বাড়তে থাকা লক্ষণকে অবহেলা না করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



