logo

রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কেন সব সময় খারাপ না

রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কেন সব সময় খারাপ না
ছবি: গেটওয়েল আর্জেন্ট কেয়ার

খাবার খাওয়ার সময় একটু এদিক-সেদিক হলেই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এটা একদম স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বিশেষ করে মিষ্টি, সাদা ভাত, পাউরুটি বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খেলে এমনটা হতে পারে। তবে রক্তে শর্করার এই সাময়িক বৃদ্ধি বা ব্লাড সুগার স্পাইক নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ নিয়মিত ব্লাড সুগার মাপছেন, আবার অনেকে স্পাইক এড়াতে খাদ্যতালিকা থেকে কার্বোহাইড্রেটই বাদ দিয়ে দিচ্ছেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করার সাময়িক বৃদ্ধি নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এটি শরীরের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। ব্লাড সুগার বাড়লেই তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এমন ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে বেশি আছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

খাবার খেলে রক্তে শর্করা বাড়ে কেন?

সবসময় সব ধরনের খাবার খেলেই যে রক্তে শর্করা বাড়বে তা কিন্তু না। আমরা যখন চিনি, মিষ্টি, ফল বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাই, তখন হজমের সময় এসব খাবারের শর্করা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই গ্লুকোজ রক্তে মিশে যাওয়ার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

এ সময় অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। ইনসুলিন রক্ত থেকে গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। কোষগুলো এই গ্লুকোজ শক্তি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে। খাবার ছাড়াও অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা উচ্চমাত্রার ব্যায়াম করলেও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে। এ সময় অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন যকৃৎকে রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ ছাড়তে সংকেত দেয়। এতে ব্যায়ামের সময় পেশি প্রয়োজনীয় শক্তি পায়।

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার স্পাইক কি স্বাভাবিক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়া শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় একটি প্রতিক্রিয়া। সাধারণত খাবার খাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে তা আবার স্বাভাবিক মাত্রার কাছাকাছি ফিরে আসে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পুষ্টি ও ডায়েটেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রাউনের মতে, প্রতিটি গ্লুকোজ স্পাইক ক্ষতিকর, এমন ধারণা ভুল। সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে খাবারের পর অল্প সময়ের জন্য রক্তে শর্করা বাড়লে সাধারণত চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তবে রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে উঁচু থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এটি শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ইঙ্গিত হতে পারে।

কখন রক্তে শর্করার বৃদ্ধি চিন্তার কারণ?

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি আগের মতো সাড়া দিতে পারে না। ফলে রক্তের গ্লুকোজ সহজে কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকতে পারে।

দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করা দীর্ঘ সময় অনিয়ন্ত্রিত থাকলে স্নায়ু ও চোখের ক্ষতি, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তবে অতিরিক্ত গ্লুকোজ সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলা গেসের মতে, শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে অতিরিক্ত শক্তি চর্বি হিসেবে জমতে পারে। এতে ওজন বাড়ে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির অন্যতম কারণ।

সুস্থ মানুষের কি নিয়মিত ব্লাড সুগার মাপা প্রয়োজন?

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা খুবই জরুরি। এজন্য অনেকে কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর বা সিজিএম ব্যবহার করেন। এই যন্ত্র শরীরে লাগানো সেন্সরের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে। বর্তমানে ডায়াবেটিস নেই এমন সুস্থ মানুষের মধ্যেও এই যন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রয়োজন ছাড়া এসব যন্ত্র ব্যবহার করলে অনেকে খাবার নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তায় পড়তে পারেন। এমনকি রক্তে শর্করার সামান্য পরিবর্তন দেখেও স্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেওয়ার মতো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তবে যাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আছে, তাদের ক্ষেত্রে গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ কিছুটা সহায়ক হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী খাবেন?

খাবারের পর রক্তে শর্করা বাড়া স্বাভাবিক হলেও কিছু খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে এর ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

আঁশযুক্ত খাবার খান: লাল চাল, লাল আটার রুটি, ডাল, শাকসবজি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে ধীর করে। ফলে রক্তে গ্লুকোজ তুলনামূলক ধীরে বাড়ে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে।

খাবারে প্রোটিন রাখুন: ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সুষম খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিন খেলে খাবার হজমের গতি ও পরবর্তী রক্তে শর্করার পরিবর্তনে প্রভাব পড়তে পারে।

স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করুন: বাদাম, বীজ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস খাবারে রাখা যেতে পারে। প্রোটিন ও আঁশের সঙ্গে এগুলো সুষম খাবার তৈরিতে সাহায্য করে। তবে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

অতিরিক্ত চিনি কমান: মিষ্টি, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো ভালো।

কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়া কি ঠিক?

রক্তে শর্করা বাড়ার ভয়ে অনেকে ভাত, রুটি, পাস্তা বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবার জন্য ভালো সিদ্ধান্ত না।

কার্বোহাইড্রেট সুষম খাদ্যতালিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এগুলো শরীরের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস। তাইি এটি বাদ দিলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। দীর্ঘদিন কার্বোহাইড্রেট কম খাওয়ার পর হঠাৎ বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বাড়তে পারে।

সবার শরীরে খাবারের প্রভাব একই রকম কি না

একই খাবার খাওয়ার পরও সবার রক্তে শর্করার মাত্রা একইভাবে পরিবর্তিত হয় না। ঘুমের পরিমাণ, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম ও খাবারের ধরন রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামায় প্রভাব ফেলে। তাই অন্য কারও খাদ্যাভ্যাস বা গ্লুকোজের মাত্রার সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনা করা ঠিক না।

সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করার সাময়িক বৃদ্ধি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত চিনি কমানো ও পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের দিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি। তবে ডায়াবেটিস বা প্রিডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

সূত্র: যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে ‘Blood sugar spikes are not necessarily bad for you’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম।