দুই সপ্তাহেও সারছে না মুখের ঘা, যে লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন

মুখের ভেতরে ছোট্ট একটি ঘা হলে বেশির ভাগ মানুষই খুব একটা গুরুত্ব দেন না। ঝাল খাবার খেলে জ্বালা করে, কথা বলতে বা খেতে অস্বস্তি হয়, তারপর কয়েক দিন পর নিজে থেকেই সেরে যায়। কখনো গালের ভেতরে কামড় লাগা, অতিরিক্ত গরম খাবার খাওয়া, মানসিক চাপ কিংবা পুষ্টির ঘাটতির কারণেও মুখে ঘা হতে পারে। সাধারণত এসব ঘা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।
কিন্তু ঘা যদি দুই সপ্তাহ পেরিয়েও না সারে, একই জায়গায় বারবার হয়, ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে কিংবা অস্বাভাবিকভাবে রক্তপাত করে, তখন বিষয়টি আর হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। এর পেছনে দাঁতের ঘর্ষণ, পুষ্টির ঘাটতি, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মুখের ঘা মুখের ক্যানসারেরও প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
সাধারণ মুখের ঘা কেন হয়?
মুখের ঘা হওয়ার অনেক সাধারণ কারণ রয়েছে। অসাবধানতাবশত গাল, ঠোঁট বা জিভে কামড় লাগলে সেখানে ক্ষত তৈরি হয়ে ঘা হতে পারে। দাঁতের কোনো ধারালো অংশ, ভাঙা দাঁত, ঠিকমতো বসানো হয়নি এমন ফিলিং বা ডেনচারও মুখের ভেতরে একই জায়গায় বারবার ঘর্ষণ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম খাবার, মানসিক চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে পুষ্টির ঘাটতির সঙ্গেও মুখের ঘায়ের সম্পর্ক থাকতে পারে। আয়রন, ভিটামিন বি১২ ও ফোলেটের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া মুখের ঘায়ের একটি কারণ হতে পারে। কিছু ওষুধ এবং নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে।
কখন মুখের ঘা নিয়ে সতর্ক হবেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘা কতদিন ধরে আছে। সাধারণ মুখের ঘা সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তাই এর চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকা ঘা পরীক্ষা করানো ভালো। তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী মুখের ঘা হলে চিকিৎসক বা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে অবহেলা করবেন না-
- দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরেও ঘা না শুকানো
- ঘা ধীরে ধীরে বড় হওয়া
- ঘা থেকে সহজে রক্তপাত হওয়া
- ঘায়ের কিনারা শক্ত বা মোটা হয়ে যাওয়া
- একই জায়গায় বারবার ঘা হওয়া
- মুখের ভেতরে দীর্ঘদিন লাল বা সাদা দাগ থাকা
- মুখ বা গলায় কোনো গুটি বা ফোলা দেখা দেওয়া
- গিলতে বা চিবাতে সমস্যা হওয়া
- জিভ নড়াতে অসুবিধা হওয়া
- মুখ বা জিভের কোনো অংশ অবশ লাগা
- গলা বসে যাওয়া বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকা
- কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
এসব লক্ষণ থাকলেই যে মুখের ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। একই ধরনের উপসর্গের পেছনে আরও অনেক সাধারণ কারণ থাকতে পারে। তবে কারণটি নিশ্চিত করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
একই জায়গায় বারবার ঘা হলে কারণ খুঁজুন
একই জায়গায় বারবার ঘা হওয়াকে অনেকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। কিন্তু দাঁতের কোনো ধারালো অংশ বা ভাঙা দাঁত যদি প্রতিদিন সেই জায়গায় ঘষা দেয়, তাহলে ক্ষতটি বারবার তৈরি হতে পারে।
এমনকি ভুলভাবে বসানো ফিলিং বা ডেনচার থেকেও একই সমস্যা হতে পারে। তাই ঘা বারবার একই জায়গায় হলে শুধু ওষুধ বা মুখের জেল ব্যবহার না করে একজন দন্ত চিকিৎসককে দিয়ে দাঁত ও মুখের ভেতর পরীক্ষা করানো ভালো।
দীর্ঘস্থায়ী ঘা কি ক্যানসারের লক্ষণ?
এই প্রশ্নটি নিয়ে অনেকেরই ভয় থাকে। বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ মুখের ঘা ক্যানসার নয়। সাধারণ মুখের ঘা খুবই পরিচিত সমস্যা এবং সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়।
তবে কিছু মুখের ক্যানসার শুরুর দিকে সাধারণ মুখের ঘায়ের মতো দেখতে পারে। বিশেষ করে কোনো ঘা যদি দীর্ঘদিনেও না সারে, বড় হতে থাকে, শক্ত হয়ে যায় বা এর সঙ্গে গুটি, রক্তপাত, গিলতে সমস্যা কিংবা অকারণে ওজন কমার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
প্রয়োজনে চিকিৎসক মুখের ভেতর পরীক্ষা করার পর আরও কিছু পরীক্ষা করতে পারেন। সন্দেহজনক কোনো অংশ থাকলে ছোট্ট নমুনা নিয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো বা বায়োপসি করা হতে পারে।
তামাক ও সুপারি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
মুখের ক্যানসারের ঝুঁকির ক্ষেত্রে তামাক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধূমপান ছাড়াও তামাক চিবানো, সুপারি ও গুটখা ব্যবহারের অভ্যাস মুখের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অ্যালকোহল সেবনও মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই মুখে দীর্ঘদিনের ঘা থাকলে এসব অভ্যাসকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং তামাক ও সুপারি থেকে দূরে থাকা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সহায়তায় এসব অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করা জরুরি।
মুখে ঘা হলে কী করবেন?
সাধারণ মুখের ঘা হলে মুখ পরিষ্কার রাখা এবং ঘায়ে বাড়তি আঘাত বা জ্বালা এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। নরম ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে পারেন। খুব ঝাল, নোনতা, টক বা অতিরিক্ত গরম খাবার কিছুদিন এড়িয়ে চললে অস্বস্তি কমতে পারে। শক্ত ও কড়কড়ে খাবারও ঘায়ে ঘর্ষণ তৈরি করতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যাদের বারবার মুখে ঘা হয় তাদের ক্ষেত্রে পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না তা চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
তবে দীর্ঘদিনের ঘা ঢাকার জন্য নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন কোনো জেল বা ওষুধ ব্যবহার করা ঠিক নয়। ঘা না সারলে এর কারণ খুঁজে বের করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
মুখের ঘা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ঘা যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারে, বারবার একই জায়গায় হয় বা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তাহলে দেরি না করে দন্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে রক্তপাত, শক্ত বা মোটা কিনারা, মুখ বা গলায় গুটি, গিলতে সমস্যা, জিভ নড়াতে অসুবিধা বা অকারণে ওজন কমার মতো লক্ষণ থাকলে আরও দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত।
মুখের একটি ছোট ঘা অনেক সময় একেবারেই সাধারণ সমস্যা। কিন্তু সেটি যদি স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে না সারে, তখন শরীরের দেওয়া সংকেতটিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ রোগটি ক্যানসার হোক বা অন্য কোনো সাধারণ সমস্যা, দ্রুত কারণ জানা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করাও সহজ হয়।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



